‘দিন পরপরই নানা ইস্যুতে উতপ্ত হয় প্রকৃতির অপরুপ সৌন্দর্য মণ্ডিত এ পাহাড়। ধারাবাহিকভাবে পাহাড়ের পরিস্থিতি নাজুক হচ্ছে দিনদিন। এখানে ক্রমাগত জাতিগত হিংসা ও বিদ্বেষ বাড়ছেই প্রতিনিয়ত। যুগযুগ ধরে সুজলা ও সম্প্রীতির এ পাহাড়ে বারবার অ-সম্প্রীতি, অশান্তি ও উত্তেজনা সৃষ্টি হওয়ার কারণ কি? ও এসব অ-পকর্মের দায় কার তা নিয়ে কৌতূহলের কমতি নেই জনমনে। যদিও এ প্রশ্নগুলোর উত্তর জানা জরুরি ও এর সমস্যাগুলোর নীতিগত ও যৌক্তিক সমাধান করা অতিব জরুরি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সকল জাতিগোষ্ঠী কিংবা সম্প্রদায়ের মানুষের শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সম্পাদিত শান্তিচুক্তির প্রায় আড়াই যুগ পরও পাহাড়ে সংঘাত, সহিংসতা ও উত্তেজনা বৃদ্ধি পাওয়ার ঘটনা খুবই দুঃখজনক বা চিন্তার বিষয়। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনেকেই বলছেন, ১৯৯৭ সালের ২ ‘রা ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিলো পাহাড়ের একটি আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর সাথে। সেখানে বর্তমানে একাধিক আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠী নানা দাবিতে সোচ্চার প্রতিনিয়ত।
সবচেয়ে সাঙ্ঘাতিক বিষয় হলো, যেকোনো তুচ্ছ বা সাধারণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ, জাতিগত ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় রুপ নিচ্ছে পাহাড়। যদিও বিষয়গুলো স্থানীয় বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় বা মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রশাসন ও স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ক্রমাগত বিদ্বেষে পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিতভাবে যেকোনো সময় যেকোনো ঘটনা ঘটার সম্ভবনা দেখা দেয়। কোথাও কোথাও ঘটেও যাচ্ছে বা ঘটেছেও।
এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এখানকার স্থানীয় অর্থনীতি। বিশেষ করে স্থানীয় বিভিন্ন ব্যবসা খাত, পরিবহন সেক্টর, হোটেল-মোটেল, রেস্তোরাঁ ও পর্যটক সংশ্লিষ্ট খাতগুলো। যেখানে জড়িত আছে পাহাড়ের স্থানীয় সকল সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ ও কর্মসংস্থান। পাহাড়ে যেকোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে যার মত অবস্থান নিলে দিনশেষে ক্ষতিগ্রস্ত ও হয়রানির শিকার হয় সকল সম্প্রদায়ের সাধারণ ও নিরীহ মানুষগুলো। কখনো বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত, কখনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত, কখনো প্রাণনাশ। ফলে কখনো কখনো থেমে যায় জীবন, থেমে যায় তাঁদের অর্থনীতির চাকা। দিনের পর দিন পিছিয়ে পড়ে সাধারণ ও নিরীহ পরিবারগুলো।
যুগের পর যুগ ধরে পাহাড়ের সমস্যা, সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গ গবেষণা ও মতবাদ ব্যক্ত করলেও ইতিবাচক কোনো ফলাফল মেলেনি আজও। সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনেকেই দায়ী করছেন বিগত পার্বত্য শান্তিচুক্তিকে। প্রশ্ন রাখছেন একটি দেশের সরকার কেন একটি আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের সাথে চুক্তি করবে?। আবার অনেকেই বলছেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন-সার্বভৌমত্ব দেশ। এ দেশের ভূখণ্ডে থাকতে হলে দেশের রাষ্ট্রীয় আইন-রীতিনীতি মানতে হবে সবার। এটা দেশের সকল অঞ্চল, সম্প্রদায়ের নাগরিক, দল বা গোষ্ঠীর জন্য। এখানে আলাদাভাবে কোনো আইন বা সংগঠনের সাথে রাষ্ট্রীয় চুক্তি করার সুযোগ নেই।
শান্তিচুক্তি পরবর্তী পাহাড়ে আরও বেশকিছু আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠন তৈরী হয়। তাঁরাও বিভিন্ন সময় তাঁদের বিভিন্ন দাবী তুলে ধরেন রাষ্ট্রের কাছে। অনেকেই মনে করছেন, সবকিছু মিলে একপর্যায়ে নিজেদের স্বার্থ, আধিপত্য বিস্তার ও অধিকারে অনিশ্চয়তা দেখা দিলেই বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ইস্যুতে পাহাড় রুপ নেয় নানা সহিংসতায়। যা একপর্যায়ে পাহাড়ে বসবাসরত সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে জাতিগত সহিংসতার সৃষ্টি করে।
প্রশ্ন হলো, এসব ঘটনার দায় কার এবং এসবের কারণ কি? এ সবকিছুর নীতিগত সমাধান খোঁজা পাহাড়ে বসবাসরত সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মঙ্গলের জন্য জরুরি। আমরা জানি, স্বাধীনতার পর পার্বত্য চট্টগ্রাম সশস্ত্র পথে চলেছিলো। ১৯৯৭ সালের ২’রা ডিসেম্বর পার্বত্য শান্তিচুক্তির মাধ্যমে তা নিয়মতান্ত্রিক পথে অগ্রসর হয়। বলা অপেক্ষা রাখে না যে, এটা অবশ্যই একটি রাজনৈতিক সাফল্য। কিন্তু চুক্তি সম্পাদিত হলেই রাতারাতি শান্তি ও সম্প্রীতি স্থাপিত হয় না। এজন্য যথাযথ উদ্যোগ নেওয়ার দরকার হয়, যার মাধ্যমে মানুষে মানুষে হিংসা ও অবিশ্বাস কমে স্থিতিশীলতা আসবে।
এছাড়াও দীর্ঘ সময় ধরেই পাহাড়ে সম্প্রদায়গত সম্প্রীতি স্থাপনের কাজটি অবহেলিত রয়েছে। চুক্তির ফলে পাহাড়ি ও বাঙালি নেতারা বিভিন্ন সময় বিভিন্ন পদ-পদবী নিয়ে মত্ত হয়ে আছেন। সামাজিক শান্তি ও সম্প্রীতি স্থাপনের জন্য তেমন কেউ এগিয়ে আসেন নি। সবাই গোষ্ঠী ও দলগত রাজনৈতিক অবস্থানে থেকে পরস্পরের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। দলের নামে, গোষ্ঠীর নামে, জাতির নামে বিরাজমান তাঁদের মধ্যকার এই লড়াই ও বিভক্তি দূর করা হয় নি বলেই একে অপরের মুখোমুখি ও সহিংসতা ও সংঘাতে জড়াতে পিছ পা হচ্ছে না।
আশ্চযের বিষয় হলো, পাহাড়ে হিংসা ও গোষ্ঠীগত দাঙ্গা-হাঙ্গামা বিরাজমান হলেও সকল সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক নের্তৃবৃন্দ, আঞ্চলিক সংগঠনের নের্তৃবৃন্দ সহ পাহাড় নিয়ে যারা গবেষণা বা কাজ করেন, তাঁরা হাতে হাত রেখে একবারের জন্যও পাহাড়ে মৈত্রী সমাবেশ করতে পারেননি। সাম্প্রদায়িকতা ভুলে সর্বদলীয় কোনও সম্প্রীতি পদযাত্রা বা মিছিলও এখানে হয়নি। একে অপরের প্রতি সন্দেহ ও অবিশ্বাস নিয়েই দল ও গোষ্ঠীগুলো বসবাস করছে পাহাড়ে।
অনেকের মতে, শান্তিচুক্তির পর বিভিন্ন রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পাহাড়ের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন করাও জরুরি ছিলো। প্রয়োজন ছিলো পাহাড়ের সকল গোষ্ঠী ও দলগুলোর মধ্যে সংলাপের আয়োজন করা। পরস্পরের মধ্যে সমঝোতা ও আদান-প্রদানেরও আবশ্যকতা ছিলো অতিব জরুরি। তাহলেই হয়তো হিংসা ও বিদ্বেষ হ্রাস পেয়ে দল ও গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমে আসতে পারতো।
সামাজিক ও সম্প্রদায়গত সম্প্রীতি ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টি করার দায়িত্ব ছিল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজ ও নাগরিক সমাজের। হতাশাজনকভাবে লক্ষ্যণীয় যে, তারা সবাই নিজ নিজ গোষ্ঠী ও দলগত ক্ষুদ্র রাজনৈতিক স্বার্থে এতোই মগ্ন যে সমাজের সামগ্রিক কল্যাণ ও শান্তির চিন্তা কিংবা প্রচেষ্টা তাঁদের কাছ থেকে মোটেও দেখা যায় নি। এতে বিভেদের দেয়াল বেড়েছে এবং প্রায়ই নানা ঘটনায় পিটিয়ে মারার ঘটনা ঘটছে বা গোষ্ঠীগত দাঙ্গা হচ্ছে। যার ধারাবাহিকতায় সকল সম্প্রদায়ের সাধারণ মানুষের জান ও মালের ব্যাপক ক্ষতিও হচ্ছে। এবং থেমে থেমে উত্তেজনা ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে। সামগ্রিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাহাড়ে বসবাসরত সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকা।
পাহাড়ে জাতিগত অসন্তোষ ও গোষ্ঠীগত দাঙ্গা, হাঙ্গামা, উত্তেজনা কেবলমাত্র বলপ্রয়োগের মাধ্যমে সমাধান সম্ভব নয়। সমাজে যদি হিংসা, অবিশ্বাস ও বিদ্বেষের বীজ থাকে, তাহলে সেটা বৃদ্ধি পাবেই। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষে সাময়িকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হলেও বিদ্বেষের বীজ উপরে ফেলা সম্ভব নয়। ফলে পাহাড়ে একের পর এক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেই চলছে।
এমতাবস্থায় পাহাড়ের সকল জাতিগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের মানুষের মাঝে শান্তি-সম্প্রীতি স্থাপন, আর্থ সামাজিক উন্নয়ন, নিরাপত্তা সহ নানা ভাবে কাজ করছে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিজিবি সহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা। এছাড়াও পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অটুট রাখতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে আসছে সেনাবাহিনী। তাছাড়াও পাহাড়ে বসবাসরত সকল জাতিগোষ্ঠীর মানুষের নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন নিশ্চিত করণে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, চাঁদাবাজি বন্ধ করা সহ বিভিন্ন সন্ত্রাসী সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে যৌথবাহিনী।
কিন্তু অতন্ত্য দুঃখের বিষয় হলো যে, পাহাড়ের সকল জাতিগোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের মানুষের নিরাপত্তা, আর্থ সামাজিক উন্নয়ন ও শান্তি-সম্প্রীতির জন্য নিরলসভাবে কাজ করা সেনাবাহিনী, বিজিবি, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা সহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ে প্রতিনিয়ত গুজব ও অপপ্রচারে লিপ্ত সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো। তাঁরা সেনাবাহিনী সহ অনান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সারাদেশ সহ বিশ্বের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ করে পাহাড় থেকে সেনাবাহিনী সরিয়ে তাঁরা তাঁদের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতেই এই গুজব ও অপপ্রচারের আয়োজন। প্রকৃত পক্ষে পাহাড়ের সকল জাতিগোষ্ঠীর মানুষের নিরাপত্তা ও শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে সেনাবাহিনী ও অনান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সবসময় সন্ত্রাসী গোষ্ঠীদের বিরুদ্ধে অবস্থা নেন। যেকারণে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো নানাভাবে সেনাবাহিনী ও অনান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সহ বিভিন্নভাবে গুজব ও অপপ্রচার চালিয়ে আসছে।
জাতিগত হিংসা ও বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে এ পাহাড় আমাদের স্বাধীন দেশেরই ভূখন্ড। পাহাড়ে বসবাসরত সকল সম্প্রদায়ের মানুষই এ দেশের নাগরিক ও সমঅধিকারী। তাই পাহাড়ের আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর প্রতিনিধি, স্থানীয় সকল সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতৃত্বকে এগিয়ে এসে সকলের সমন্বয়ে পাহাড়ের চলমান হিংসা ও অবিশ্বাসের দেয়াল ভাঙতে হবে। সকল জাতিগোষ্ঠীর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ সৃষ্টির মধ্যে দিয়েই পাহাড়ের সকল বৈষম্য দূর করে সম্প্রীতি ও সহমর্মিতায় পাহাড়কে সমুন্নত করতে হবে। সকল সম্প্রদায়ের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা একটাই, হিংসা দ্বন্দ্ব ও সংঘাত নয়, সুজলা সুফলা ও প্রকৃতির এই বৈচিত্র্যময় পাহাড়ের কল্যান ও সৌন্দর্য রক্ষার্থে পাহাড়ের সম্প্রীতি ও মঙ্গল কামনাই সকলের কল্যান।
_এম মহাসিন মিয়া, সাংবাদিক ও লেখক।

