বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট এক স্মরণীয় ও আলোচিত অধ্যায়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ক্রমান্বয়ে সারাদেশে গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। রাজধানী ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামও ছিল এই আন্দোলনের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। চট্টগ্রাম মহানগর থেকে শুরু করে জেলার বিভিন্ন উপজেলা পর্যন্ত আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষ, হতাহত, গ্রেপ্তার, অগ্নিসংযোগ, আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে এক উত্তাল সময় অতিক্রম করে বন্দরনগরী।
জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে চট্টগ্রাম নগরের মুরাদপুর, ষোলশহর, দুই নম্বর গেট, বহদ্দারহাট, জিইসি মোড়, টাইগারপাস, নিউমার্কেট, আন্দরকিল্লা, লালদীঘি, চকবাজার ও শাহ আমানত সেতু এলাকায় আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতার সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। বিভিন্ন স্থানে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, রাবার বুলেট এবং গুলিবর্ষণের ঘটনা জাতীয় সংবাদমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হয়।
এসব ঘটনায় বহু শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ আহত হন। আন্দোলনের সময় চট্টগ্রাম কলেজের শিক্ষার্থী ওয়াসিম আকরামের মৃত্যু দেশব্যাপী তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। এছাড়া মো. ফারুকসহ আরও কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসে। পরবর্তী দিনগুলোতে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়ে এবং আহতের সংখ্যা কয়েক শতাধিক ছাড়িয়ে যায় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট), আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম (IIUC), চট্টগ্রাম কলেজ, সরকারি হাজী মুহাম্মদ মহসিন কলেজ, সরকারি কমার্স কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। নগরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে অবস্থান কর্মসূচি, বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এর ফলে দীর্ঘ সময় যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং জনজীবনে নেমে আসে অচলাবস্থা।
পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জেলার পটিয়া, রাউজান, হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, মীরসরাই, সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা, বাঁশখালী ও কর্ণফুলী উপজেলাতেও আন্দোলনের বিস্তার ঘটে। কোথাও কোথাও সরকারি স্থাপনা ও রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হন। চট্টগ্রামের পাশাপাশি সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে গভীর উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তা।
৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো চট্টগ্রামেও প্রশাসনিক কার্যক্রমে সাময়িক শূন্যতা এবং আইনশৃঙ্খলার ব্যাপক অবনতি দেখা দেয়। কয়েকটি থানায় হামলা, অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট, সরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি হয়। ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়ে, অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় এবং রাতের বেলায় নগরজুড়ে এক অজানা আতঙ্ক বিরাজ করতে থাকে।
এই সংকটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণ করে। তৎকালীন চট্টগ্রাম এরিয়া কমান্ডার ও জিওসি মেজর জেনারেল মো. মাইনুর রহমানের (বর্তমান লেফটেন্যান্ট জেনারেল) বিচক্ষণী নেতৃত্বে চট্টগ্রাম সেনানিবাস পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করে। উর্ধ্বতন কতৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন হয় এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যক্রম শুরু করে।
চট্টগ্রাম বন্দর, শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (কেপিজেড), রেলওয়ে স্টেশন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি স্থাপনা, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, আদালত, হাসপাতাল, ব্যাংক এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় সেনাসদস্যদের উপস্থিতি জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে নগরের মুরাদপুর, জিইসি মোড়, বহদ্দারহাট, টাইগারপাস, নিউমার্কেট, দুই নম্বর গেট, লালদীঘি, আগ্রাবাদ, আন্দরকিল্লা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় নিয়মিত টহল, নিরাপত্তা চৌকি এবং নজরদারি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
আইনশৃঙ্খলা পুনঃপ্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুট হওয়া অস্ত্র, গোলাবারুদ ও সরকারি মালামাল উদ্ধারে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ অভিযান পরিচালিত হয়। বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার, সরকারি সম্পদ পুনরুদ্ধার, গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জনজীবন স্বাভাবিক করতে সেনাসদস্যরা দিন-রাত নিরলস দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি জরুরি সেবার যানবাহন চলাচল নিশ্চিত করা, সড়ক যোগাযোগ সচল রাখা, শিল্পাঞ্চল ও বন্দর এলাকার নিরাপত্তা জোরদার করা এবং জনগণের মধ্যে আস্থা ফিরিয়ে আনতেও সেনাবাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সংকটকালীন সময়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব, শৃঙ্খলা, সংযম এবং দায়িত্বশীল কর্মকাণ্ড চট্টগ্রামের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সহায়ক ভূমিকা রাখে। সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী, বিজিবি, পুলিশ, র্যাব সহ অনান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কতৃক পরিচালিত টহল ও নিরাপত্তা কার্যক্রমের ফলে ধীরে ধীরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা-বাণিজ্য, পরিবহন ব্যবস্থা এবং সরকারি দপ্তরগুলো পুনরায় সচল হতে শুরু করে। জনমনে ফিরে আসে স্বস্তি ও নিরাপত্তার অনুভূতি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় এবং পরবর্তী দিনগুলোতে বহু পরিবার তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে। শত শত মানুষ আহত হয়েছেন, অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। অসংখ্য শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষ সেই ভয়াবহ সময়ের প্রত্যক্ষ সাক্ষী। হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা নিরলসভাবে আহতদের সেবা দিয়েছেন। একই সঙ্গে বহু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রক্তদান, চিকিৎসা সহায়তা এবং মানবিক সহযোগিতার মাধ্যমে অসংখ্য মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান কেবল একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ঘটনা নয়, এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, নাগরিক অধিকার এবং গণতান্ত্রিক চর্চা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগও সৃষ্টি করেছে। চট্টগ্রামের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে, একটি বড় জাতীয় সংকটের সময় জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কার্যকারিতা বজায় রাখা এবং জনগণের আস্থা ধরে রাখা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে সংকট-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে রাষ্ট্রের বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর সমন্বিত দায়িত্ব পালনও ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।
ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়ের মতো জুলাই গণঅভ্যুত্থানও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আরও গবেষণা, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্তের আলোকে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে সত্য ইতিহাস তুলে ধরতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ অনুসন্ধান, তথ্যনির্ভর গবেষণা এবং দায়িত্বশীল দলিল সংরক্ষণ। চট্টগ্রামের সেই রক্তাক্ত ও অস্থির দিনগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, সংকট যত গভীরই হোক, আইনের শাসন, শান্তি, মানবিকতা, জাতীয় ঐক্য এবং দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বই একটি দেশকে পুনরায় স্থিতিশীলতার পথে ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে বড় শক্তি।
লেখক: এম মহাসিন মিয়া
সাংবাদিক, লেখক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
ইমেইল: mmohasinmiah013@gmail.com
জুলাই গণঅভ্যুত্থান- ২০২৪: ফিরে দেখা চট্টগ্রাম, সংকট ও পুনর্গঠনের ইতিহাস
এই বিভাগের আরও খবর
Add A Comment
সম্পাদক: অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন মজুমদার
প্রকাশক: মো: মনির হোসেন
ঠিকানা
৮ম তলা, হক টাওয়ার, ৪৬/৬ বাগানবাড়ি, বণশ্রী রামপুরা,ঢাকা-১২১৯
সিরাজুল ইসলাম বিল্ডিং (৩য় তলা), শাপলা চত্বর, খাগড়াছড়ি
© 2026 Anusandhan.news || Developed by MicroWeb Technology Ltd.

