পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাস, প্রশাসনিক কাঠামো ও বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা বিতর্ক, বিভ্রান্তি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা চলে আসছে। বিশেষ করে “চাকমা রাজা”, “বোমাং রাজা” কিংবা “মং রাজা” শব্দগুলোকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন তারা কোনো স্বাধীন রাজ্যের সার্বভৌম শাসক ছিলেন বা এখনো আছেন। অথচ বাস্তব ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে পার্বত্য অঞ্চলে প্রশাসনিক সুবিধা ও খাজনা আদায়ের উদ্দেশ্যে যেসব সার্কেল চিফ নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, সময়ের ব্যবধানে তাদের ঘিরেই “রাজা” তকমা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
ঐতিহাসিকভাবে পার্বত্য চট্টগ্রাম কখনোই পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল না। ব্রিটিশরা ১৮৬০ সালের পর পার্বত্য চট্টগ্রামকে প্রশাসনিকভাবে নিয়ন্ত্রণে এনে অঞ্চলটিকে কয়েকটি সার্কেলে ভাগ করে। মূল উদ্দেশ্য ছিলো পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত জনগোষ্ঠীর উপর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, রাজস্ব আদায় এবং ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষা করা। সেই প্রেক্ষাপটে চাকমা, মং ও বোমাং সার্কেল গঠন করা হয় এবং সার্কেল চিফদের মাধ্যমে স্থানীয় শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করা হতো।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই সার্কেল চিফরা কোনো স্বাধীন রাজ্যের সম্রাট ছিলেন না। তারা ছিলেন মূলত ব্রিটিশ প্রশাসনের অধীনস্থ স্থানীয় প্রতিনিধি বা মধ্যস্থতাকারী। তাদের কাজ ছিল খাজনা আদায়, স্থানীয় বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ব্রিটিশদের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা। ব্রিটিশ সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের ক্ষমতা দিতো, আবার সীমাবদ্ধও করতো। অর্থাৎ তাদের ক্ষমতার উৎস ছিলো জনগণ নয়, বরং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রশাসন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই সার্কেল চিফদের ঘিরে এক ধরনের কৃত্রিম অভিজাত শ্রেণি তৈরি হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তান আমল এবং স্বাধীন বাংলাদেশেও কিছু গোষ্ঠী নিজেদের ঐতিহাসিক গুরুত্ব বাড়ানোর জন্য “রাজা” শব্দটিকে রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে ব্যবহার করতে থাকে। সাধারণ উপজাতি জনগোষ্ঠীর অনেককেই ইতিহাসের আংশিক ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানো হয় যে তারা কোনো “স্বাধীন রাজ্যের” উত্তরসূরি। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, ব্রিটিশদের প্রশাসনিক সুবিধার জন্য সৃষ্ট একটি কাঠামোকে পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ বানানো হয়েছে।
বর্তমান সময়ে প্রশ্ন উঠছে, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হওয়ার পরও কেন ব্রিটিশ আমলের এই বিশেষ প্রশাসনিক কাঠামো বহাল থাকবে? যখন দেশের অন্য কোথাও ব্রিটিশদের নিয়োগ দেওয়া খাজনা আদায়ের প্রতিনিধিদের বিশেষ মর্যাদা নেই, তখন পার্বত্য চট্টগ্রামে কেন সেই ব্যবস্থা আজও বিশেষ সুবিধা পাবে?
বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রের সকল নাগরিক সমান অধিকার ভোগ করে। পার্বত্য চট্টগ্রামও বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফলে এই অঞ্চলের প্রশাসন, বিচার ও সামাজিক কাঠামোও স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান ও আইনের আলোকে পরিচালিত হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, কিছু মহল এখনো ব্রিটিশ আমলের বিশেষ কাঠামোকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করে বিভাজনের রাজনীতি করছে।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নিয়ে প্রায়ই একপাক্ষিক ও অতিরঞ্জিত প্রচারণা চালানো হয়। সেখানে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, উন্নয়ন কার্যক্রম কিংবা সকল জনগোষ্ঠীর সহাবস্থানের বাস্তবতা অনেক সময় আড়াল করা হয়। কিছু গোষ্ঠী নিজেদের ঐতিহাসিক অবস্থানকে “রাজকীয়” পরিচয়ে তুলে ধরে আন্তর্জাতিক মহলে আলাদা রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে। এতে পার্বত্য অঞ্চলের প্রকৃত সমস্যা সমাধানের চেয়ে বিভাজন ও অবিশ্বাস বাড়ে।
অথচ বাস্তবতা হলো, পার্বত্য চট্টগ্রামে শুধু একটি বা দুটি জনগোষ্ঠী বসবাস করে না। এখানে বাঙালি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, খিয়াং, বম, চাকসহ বহু জাতিগোষ্ঠীর মানুষ একসঙ্গে বসবাস করছে। স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে সবার অধিকার সমান। কোনো একটি গোষ্ঠী বা ঐতিহাসিক পরিবারকে কেন্দ্র করে পুরো অঞ্চলের প্রতিনিধিত্ব নির্ধারণ করা গণতান্ত্রিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এছাড়া পার্বত্য অঞ্চলের সাধারণ মানুষের বড় অংশ এখন উন্নয়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেয়। তারা সংঘাত, বিভাজন বা পুরনো উপনিবেশিক মানসিকতার রাজনীতি চায় না। পাহাড়ের সাধারণ মানুষ চায় শান্তি, সমঅধিকার ও উন্নয়ন। কিন্তু কিছু রাজনৈতিক ও স্বার্থান্বেষী মহল পুরনো পরিচয় ও আবেগকে ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে চায়।
এখানে আরেকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশরা যেসব প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করেছিল, সেগুলোর বেশিরভাগই ছিল তাদের উপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখার কৌশল। ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলে তারা বিভক্ত প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করেছিল যাতে স্থানীয় জনগোষ্ঠী একক জাতীয় চেতনায় সংগঠিত হতে না পারে। পার্বত্য চট্টগ্রামের সার্কেল ব্যবস্থাও অনেকাংশে সেই নীতির অংশ ছিল। ফলে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই ব্যবস্থাগুলো নতুনভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তবে এই আলোচনা অবশ্যই দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক হওয়া দরকার। কোনো জনগোষ্ঠী বা সম্প্রদায়কে হেয় করা নয়, বরং ইতিহাসের বাস্তবতা তুলে ধরা এবং স্বাধীন বাংলাদেশের সাংবিধানিক কাঠামোর আলোকে বিষয়গুলো পর্যালোচনা করাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত। কারণ পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে হলে সকল জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও আস্থা তৈরি করা জরুরি।
আজকের বাস্তবতায় পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা কোনো রাজনৈতিক পরিচয়ের ক্ষেত্র হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের বহুজাতিক ও বহুসাংস্কৃতিক ঐক্যের অংশ হিসেবেই দেখতে হবে। এখানে বসবাসরত প্রতিটি মানুষ বাংলাদেশের নাগরিক, এবং রাষ্ট্রের আইন ও সংবিধানই হবে সবার জন্য চূড়ান্ত কাঠামো।
সুতরাং, ব্রিটিশ শাসনামলে খাজনা আদায়ের উদ্দেশ্যে গড়ে ওঠা সার্কেল চিফ ব্যবস্থাকে ঘিরে কৃত্রিম “রাজা” পরিচয় তৈরি করে বিভাজনের রাজনীতি করার পরিবর্তে এখন সময় এসেছে বাস্তব ইতিহাস, সাংবিধানিক সমতা ও জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে নতুনভাবে ভাবার। স্বাধীন বাংলাদেশের ভূখণ্ডে কোনো উপনিবেশিক মানসিকতা নয়, বরং সমঅধিকার, উন্নয়ন ও জাতীয় সংহতিই হওয়া উচিত পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ পথচলার মূল ভিত্তি।
লেখক: এম মহাসিন মিয়া
সাংবাদিক, লেখক ও আঞ্চলিক গবেষক, পার্বত্য চট্টগ্রাম।
ইমেইল: mmohasin942297@gmail.com
পার্বত্য চট্টগ্রাম প্রসঙ্গ: ব্রিটিশদের খাজনা আদায়ের সার্কেল চিফ থেকে “রাজা” বনে যাওয়ার ইতিহাস ও বর্তমান বাস্তবতা
এই বিভাগের আরও খবর
Add A Comment
সম্পাদক: অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন মজুমদার
প্রকাশক: মো: মনির হোসেন
ঠিকানা
৮ম তলা, হক টাওয়ার, ৪৬/৬ বাগানবাড়ি, বণশ্রী রামপুরা,ঢাকা-১২১৯
সিরাজুল ইসলাম বিল্ডিং (৩য় তলা), শাপলা চত্বর, খাগড়াছড়ি
© 2026 Anusandhan.news || Developed by MicroWeb Technology Ltd.

