“নারীর অধিকার, শিশুর সুরক্ষা এবং পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে বাংলাদেশে প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো রয়েছে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এসব আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন। বিচার যেন মানুষের জন্য সহজ, দ্রুত ও মানবিক হয়, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।”—এভাবেই নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধবিষয়ক মতবিনিময় সভায় নিজের বক্তব্য শুরু করেন খাগড়াছড়ির সিনিয়র সিভিল জজ ও জেলা লিগ্যাল এইড অফিসার ফারজানা আক্তার।
তিনি বলেন, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে ২০১০ সালে পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন, শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করতে শিশু আইন, ২০১৩ এবং যৌতুকের মতো সামাজিক ব্যাধি প্রতিরোধে যৌতুক নিরোধ আইন কার্যকর রয়েছে। আইনের অভাব নয়, বরং সঠিক প্রয়োগই নারী ও শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করার প্রধান শর্ত। নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ, সহিংসতার শিকার নারী ও কন্যাশিশুর জন্য প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের লক্ষ্যে মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সকালে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের মিলনপুরস্থ হোটেল গাইরিংয়ের হলরুমে এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতি।
“সহিংসতার শিকার নারী ও কন্যাশিশুর জন্য প্রয়োজনীয় সেবা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় এবং সহিংসতা প্রতিরোধে করণীয়” শীর্ষক এ সভায় খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক গীতিকা ত্রিপুরা সভাপতিত্ব করেন।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রোকেয়া বেগম, খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদের সদস্য জয়া ত্রিপুরা, ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. রতন খীসা, খাগড়াছড়ি সদর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মেজবাহ উদ্দিন, তৃণমূল উন্নয়ন সংস্থার এম্পাওয়ারমেন্ট প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক শাশ্বতী দেওয়ান এবং এসআই মো. ইসমাইল হোসেন। এছাড়া পুলিশ প্রশাসন, জেলা প্রশাসন, সমাজসেবা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফারজানা আক্তার বলেন, দেশের প্রচলিত বিচারব্যবস্থায় একটি মামলা দায়েরের পর এফআইআর, তদন্ত, তদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষ্যগ্রহণ ও যুক্তিতর্কসহ দীর্ঘ প্রক্রিয়া অতিক্রম করতে হয়। ফলে বিচারপ্রার্থীদের বছরের পর বছর আদালতে ঘুরতে হয় এবং দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করেও অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পান না।
তিনি বলেন, এই ভোগান্তি কমিয়ে মানুষের দোরগোড়ায় সহজ, দ্রুত ও কার্যকর আইনি সেবা পৌঁছে দিতে জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান আইন প্রণয়ন করা হয়েছে এবং প্রতিটি জেলায় জেলা লিগ্যাল এইড অফিস প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, লিগ্যাল এইড অফিসে শুধু অসহায় মানুষই নয়, প্রয়োজন হলে যে কোনো নাগরিক বিনামূল্যে আইনি পরামর্শ নিতে পারেন। পারিবারিক বিরোধ, সহিংসতা কিংবা অন্য কোনো আইনি জটিলতায় ভুক্তভোগীরা সরাসরি অফিসে এসে অথবা সরকারি হেল্পলাইন ও নির্ধারিত যোগাযোগ নম্বরের মাধ্যমে সেবা গ্রহণ করতে পারেন। ফারজানা আক্তার বলেন, কোনো বিরোধ আদালতের বাইরে সমাধানের সুযোগ থাকলে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি (Alternative Dispute Resolution-ADR) পদ্ধতিতে উভয় পক্ষকে মুখোমুখি বসিয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে সময়, অর্থ ও ভোগান্তি কমে এবং অনেক পারিবারিক ও আর্থিক বিরোধ সফলভাবে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে সমাধান সম্ভব হয়। তবে সমঝোতা সম্ভব না হলে বিষয়টি আদালতে মামলা হিসেবে পাঠানো হয়। তিনি জানান, বর্তমানে খাগড়াছড়ি জেলা লিগ্যাল এইড অফিসের অধীনে ৩৪ জন প্যানেলভুক্ত আইনজীবী রয়েছেন, যারা সরকারিভাবে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদান করেন। এছাড়া ধর্ষণ মামলায় প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ডিএনএ পরীক্ষার বিষয়ে আইনি সহায়তা এবং দীর্ঘদিন পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কার্যক্রম গ্রহণেও লিগ্যাল এইড অফিস প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়ে থাকে।
মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণকারীরা নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ, ভুক্তভোগীদের জন্য সহজলভ্য ও মানসম্মত সেবা নিশ্চিতকরণ, আইনি সহায়তা, মনোসামাজিক সেবা, পুনর্বাসন এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

