সম্পাদকীয়: পার্বত্য চট্টগ্রাম শুধু পাহাড়, অরণ্য আর নদীর অনুপম মায়াময়তা নয়, এ অঞ্চল মানুষের চিন্তা, চেতনা ও সৃজনশীলতারও এক অনন্য জন্মভূমি। সেই নৈসর্গিক পাহাড়ি পরিবেশেই বেড়ে ওঠা তরুণ সাংবাদিক ও লেখক এম মহাসিন মিয়া তাঁর দ্বিতীয় স্বরচিত কাব্যগ্রন্থ ‘নির্জনে’ প্রকাশের মাধ্যমে আবারও জানিয়ে দিলেন, লেখালেখি তাঁর কাছে শুধু পেশা নয়, এটি তাঁর আত্মারই এক অনিবার্য প্রশ্বাস।
‘নির্জনে’ বইটির নাম যেমন নিঃশব্দ, এর ভেতরের পৃথিবীও তেমনই নীরব অথচ গভীর। আজকের কোলাহলময় সময়ে যেখানে মনোযোগ ও অনুভবের জায়গাগুলো ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে, সেখানে এম মহাসিন মিয়া নিজের মতো করে খুঁজে নিয়েছেন অন্তরের নিস্তব্ধ গলিপথ। এই কাব্যগ্রন্থে রয়েছে নিঃসঙ্গতার নিপুণ ব্যাখ্যা, আত্মজিজ্ঞাসার অনাবিল স্পর্শ, আর প্রকৃতির মমতাময় আঁচলে আশ্রয় নেওয়া এক তরুণ কবির হৃদয়ের কথা। পাঠক বইটি হাতে নিলেই উপলব্ধি করবে, নির্জনতা কখনো শূন্যতা নয়, বরং মানুষের গভীরতম অনুভূতির গোপন দরজা।
১৯৯৭ সালের দোসরা ফেব্রুয়ারিতে জন্ম নেওয়া এম মহাসিন মিয়া যেন জন্ম থেকেই পাহাড়ি প্রকৃতির শব্দহীন সংগীত অনুভব করে বড় হয়েছেন। তাঁর বাবা- বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোতালেব সুফি এবং মা- রাবেয়া আক্তার দু’জনেই সাবেক সমাজকর্মী। তাই মানবিকতা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধও তাঁর সৃষ্টিশীলতার মূল ভিত। এই প্রেক্ষাপটই তাঁকে করে তুলেছে এক গভীর ভাবুক এবং মননশীল লেখক।
এর আগে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘মেঘের খামে’ পাঠকের প্রশংসা কুড়িয়েছিল। ব্যক্তিগত অনুভূতি, প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়ার আবেদন এবং জীবনের ক্ষুদ্র অথচ গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর প্রতি সংবেদনশীলতার অনন্য প্রকাশ ছিল সেই গ্রন্থে। আর এবার ‘নির্জনে’তে তিনি আরও পরিণত, আরও পরিশীলিত। আত্মঅনুসন্ধান, নৈঃশব্দ্যের ভাষা, প্রকৃতির সান্নিধ্য, সবকিছুকে তিনি শব্দে রূপ দিয়েছেন এমনভাবে, যা পাঠককে নিজের অস্তিত্বটিকেও নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
স্বরচিত দুই কাব্যগ্রন্থের পাশাপাশি তাঁর যৌথ প্রকাশিত বইগুলো- ‘অরণ্যকলি’, ‘অরণ্যের ফুল’, ‘খোঁচা’, ‘কভিড বিশ্ব ও কবিতা’ সহ প্রকাশিত একাধিক গ্রন্থ প্রমাণ করে যে তিনি শুধু কবি নন, বরং একজন অনুসন্ধিৎসু লেখক। বিশেষত পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়ে তাঁর গবেষণা ও নিয়মিত লেখালেখি এ অঞ্চলের বাস্তবতা, সংস্কৃতি ও সামাজিক প্রশ্নগুলোকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসছে।
একজন তরুণ লেখক হিসেবে এম মহাসিন মিয়ার অবদান শুধু সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সাংবাদিকতা, গবেষণা, সংস্কৃতি ও সমাজ নিয়ে কাজ করছেন, অর্থাৎ তিনি নিজের সময়কে বুঝতে ও বদলাতে চান সেই লেখক শ্রেণির একজন। তাঁর লেখা আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে অনলাইন, ম্যাগাজিন সহ সবখানেই পাঠককে ভাবায়, আলোচনায় আনে, প্রশ্ন তোলে।
‘নির্জনে’ তাই শুধু একটি বই নয়, এটি এক তরুণ লেখকের পরিণত পথে যাত্রার নতুন অধ্যায়। নিঃসঙ্গতার আলো-অন্ধকারে নিজের অনুভূতিকে যিনি শব্দে বাঁধতে পারেন, তিনি একদিন সমাজের অনুভূতিও লিখে ফেলতে পারেন। এম মহাসিন মিয়া ঠিক সেই পথেই হাঁটছেন।
আমরা আশা করি, ‘নির্জনে’ পাঠকের হৃদয়ে নীরব অথচ গভীর এক আলো জ্বালাবে, আর এই তরুণ লেখকের সাহিত্যযাত্রা আরও প্রসারিত হয়ে দেশের সৃজনশীল জগতে যোগ করবে নতুন সম্ভাবনার রং।

