নারীর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার নিশ্চিত না করে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো বৈচিত্র্যময় ও দুর্গম অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা নিয়ে নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্থানীয় নারীদের অভিজ্ঞতা, মতামত ও নেতৃত্বকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বক্তারা।
তারা বলেছেন, নারীদের শুধু নিরাপত্তার সুবিধাভোগী হিসেবে দেখলে হবে না; শান্তি প্রতিষ্ঠা, সংঘাত প্রতিরোধ, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও নেতৃত্বের প্রতিটি পর্যায়ে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তৃণমূলের নারীর কণ্ঠস্বরকে জাতীয় নীতি ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারের সঙ্গে যুক্ত করলেই নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা (WPS) এজেন্ডার কার্যকর বাস্তবায়ন সম্ভব।
সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে খাগড়াছড়ি জেলা সদরের পর্যটন মোটেল হলরুমে ‘Dialogue on Local Voices, Global Rights: CSO Action on UNSCR 1325 and WPS Agenda’ শীর্ষক সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন।
বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘের (BNPS) আয়োজনে, খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতির সার্বিক ব্যবস্থাপনায় এবং ইউএন উইমেনের সহযোগিতায় এ সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।
সংলাপে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ১৩২৫ নম্বর প্রস্তাব (UNSCR 1325) বাস্তবায়ন, নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা, সহিংসতা প্রতিরোধ, শান্তি প্রতিষ্ঠায় নারীর নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় পর্যায়ে নাগরিক সমাজের করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
বক্তারা বলেন, UNSCR 1325 শুধু সংঘাত-পরবর্তী সময়ে নারীর সুরক্ষার বিষয় নয়। সংঘাত প্রতিরোধ, শান্তি প্রতিষ্ঠা, সুরক্ষা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই নারীর কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক কাঠামো। তাই স্থানীয় পর্যায়ে নারী নেতৃত্বের বিকাশের পাশাপাশি নাগরিক সমাজের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি।
আলোচনায় খাগড়াছড়ির নারীদের জীবন-অভিজ্ঞতা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলোও গুরুত্ব পায়। পাহাড়ি জনপদের নারীদের অভিজ্ঞতা ও মতামত নীতিনির্ধারণের টেবিলে যথাযথভাবে প্রতিফলিত না হলে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না বলে মত দেন বক্তারা।
তাদের মতে, তৃণমূল পর্যায়ের নারী নেতৃত্ব ও নাগরিক সমাজের কণ্ঠস্বরকে জাতীয় পর্যায়ের নীতি এবং আন্তর্জাতিক WPS এজেন্ডার সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে নারী ও কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ, সচেতনতা, নেতৃত্ব বিকাশ এবং অংশীজনদের মধ্যে সমন্বিত কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
সংলাপে বক্তারা আরও বলেন, শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো শুধু অধিকার নিশ্চিত করার বিষয় নয়; এটি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই শান্তির অন্যতম পূর্বশর্ত। স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নারী নেতৃত্বকে সামনে রেখে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আরও শক্তিশালী হবে।
আয়োজকেরা জানান, স্থানীয় পর্যায়ে নারীদের কণ্ঠস্বরকে আরও শক্তিশালী করা এবং শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় নাগরিক সমাজের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করাই এ সংলাপের মূল লক্ষ্য। সংলাপ থেকে উঠে আসা সুপারিশগুলো সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের কাছে তুলে ধরার পাশাপাশি ভবিষ্যতে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনা রয়েছে।
সংলাপে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ, WPS-এর প্ল্যানিং প্রতিনিধি, খাগড়াছড়ি জেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা সুষ্মিতা খীসা, জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রোকেয়া বেগম, বিএনপিএস প্রতিনিধি, ডব্লিউপিএস প্রতিনিধি এবং খাগড়াপুর মহিলা কল্যাণ সমিতির নির্বাহী পরিচালক গীতিকা ত্রিপুরা।
এ ছাড়া নারী নেত্রী, হেডম্যান-কার্বারী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, উন্নয়নকর্মী, বিভিন্ন সামাজিক ও উন্নয়ন সংগঠনের প্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা সংলাপে অংশ নেন।

