কুষ্ঠ রোগ সম্পর্কে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, আক্রান্ত মানুষের প্রতি বৈষম্য ও কুসংস্কার দূর করা এবং কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমন্বিত ভূমিকা জোরদারের লক্ষ্যে খাগড়াছড়িতে অ্যাডভোকেসি ও নেটওয়ার্কিং বিষয়ক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) সকালে খাগড়াছড়ি জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে The Leprosy Mission International-Bangladesh (TLMI-B)-এর আয়োজনে এবং The Leprosy Mission Denmark ও Center for Church-Based Development (CKU)-এর সহযোগিতায় এ প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত হয়।
প্রশিক্ষণে সভাপতিত্ব করেন নির্মল কুমার চাকমা। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ির সিভিল সার্জন ডা. রতন খীসা। এ সময় সহকারী সিভিল সার্জন ডা. অর্ণব চাকমাসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রশিক্ষণে CHT Leprosy Control and Rehabilitation Project-এর প্রকল্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন প্রকল্প ব্যবস্থাপক পরশ চাকমা। প্রশিক্ষণের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় ছিলেন CHT Leprosy Control and Rehabilitation Project এবং দি লেপ্রসি মিশন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ, খাগড়াছড়ির সমন্বয়কারী বীর মোহন ত্রিপুরা।
প্রশিক্ষণে বক্তারা বলেন, কুষ্ঠ রোগ নিরাময়যোগ্য হলেও রোগটি নিয়ে মানুষের মধ্যে এখনো ভয়, ভুল ধারণা ও সামাজিক stigma রয়েছে। ফলে অনেক আক্রান্ত ব্যক্তি সময়মতো চিকিৎসা নিতে আগ্রহী হন না। এ কারণে কুষ্ঠ রোগ শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং আক্রান্ত মানুষের সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত করতে পরিবার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, হেডম্যান-কার্বারী, ধর্মীয় নেতা, কমিউনিটি লিডার, স্বাস্থ্যকর্মী, এনজিও ও নারী সংগঠনসহ সব পক্ষকে একযোগে কাজ করতে হবে।
অ্যাডভোকেসিতে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গঠনের গুরুত্ব: প্রশিক্ষণে অ্যাডভোকেসি ও নেটওয়ার্কিংয়ের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলা হয়, কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর যোগাযোগ ও পারস্পরিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে অ্যাডভোকেসির জন্য শক্তিশালী কণ্ঠস্বর তৈরি, সম্পদ ও দক্ষতা ভাগাভাগি, সমস্যার দ্রুত ও কার্যকর সমাধান, প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা বৃদ্ধি এবং কমিউনিটিতে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব।
একই সঙ্গে বিভিন্ন সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় বাড়লে একই ধরনের কাজ বারবার করার প্রবণতা কমবে এবং সীমিত সম্পদকে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে বলেও প্রশিক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
কুষ্ঠ রোগের প্রধান লক্ষণ কী?- কুষ্ঠ রোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ হলো ত্বকে এমন ফ্যাকাশে, সাদা বা লালচে দাগ, যেখানে অন্য ত্বকের তুলনায় অনুভূতি কমে যেতে পারে বা একেবারেই থাকে না। আক্রান্ত স্থানে স্পর্শ, ব্যথা কিংবা গরম-ঠান্ডা অনুভূতি কমে যাওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত।
এ ছাড়া হাতে-পায়ে অবশভাব বা দুর্বলতা, স্নায়ু মোটা বা ফুলে যাওয়া, হাত-পায়ের পেশির শক্তি কমে যাওয়া, দীর্ঘদিনের ক্ষত বা আঘাত বুঝতে না পারা এবং নাকের সমস্যাসহ বিভিন্ন উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই নিজে থেকে কুষ্ঠ রোগের সিদ্ধান্ত না নিয়ে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কুষ্ঠ হলে কী করণীয়?_ কুষ্ঠ রোগের লক্ষণ দেখা দিলে ভয় বা লজ্জা না পেয়ে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা গেলে কুষ্ঠ রোগ সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব এবং স্থায়ী অক্ষমতার ঝুঁকিও কমানো যায়।
চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নিয়মিত ও সম্পূর্ণ চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। মাঝপথে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়। আক্রান্ত ব্যক্তিকে পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন না করে চিকিৎসা গ্রহণে উৎসাহিত করতে হবে।
কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসা ও প্রতিকার: কুষ্ঠ রোগের চিকিৎসায় মাল্টিড্রাগ থেরাপি (MDT) ব্যবহার করা হয়। রোগের ধরন ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারিত সময় পর্যন্ত নিয়মিত ওষুধ গ্রহণ করতে হয়। বাংলাদেশে সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার মাধ্যমে কুষ্ঠ রোগ শনাক্তকরণ ও চিকিৎসার ব্যবস্থা রয়েছে।
কুষ্ঠ রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ হলো দ্রুত শনাক্তকরণ ও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা। পরিবারের কারও কুষ্ঠ শনাক্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে স্বাস্থ্যকর্মী বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শে থাকা ব্যক্তিদের পরীক্ষা করানো গুরুত্বপূর্ণ।
কুষ্ঠ রোগ কোনো অভিশাপ নয়, কোনো পাপের শাস্তিও নয়—এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য সংক্রামক রোগ। সময়মতো চিকিৎসা নিলে আক্রান্ত ব্যক্তি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। তাই রোগীকে ঘৃণা বা অবহেলা নয়, প্রয়োজন সহমর্মিতা, চিকিৎসা ও সামাজিক সহযোগিতা।
অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিরা: অ্যাডভোকেসি ও নেটওয়ার্কিং বিষয়ক এ প্রশিক্ষণে জেন্ডার সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কমিউনিটি ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। এতে স্থানীয় হেডম্যান, কার্বারী, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ, কমিউনিটি লিডার, এনজিও এবং নারী সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কুষ্ঠ রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য কমিউনিটি পর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া, আক্রান্ত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা এবং সামাজিক বৈষম্য দূর করার ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারীদের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হবে বলে আয়োজকরা আশা প্রকাশ করেন।
বক্তারা বলেন, কুষ্ঠমুক্ত সমাজ গড়তে শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ। সচেতনতা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, নিয়মিত চিকিৎসা এবং আক্রান্ত মানুষের প্রতি মানবিক আচরণই পারে কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণের পথকে আরও এগিয়ে নিতে।

