পাহাড়ের দুর্গম জনপদে বসবাসকারী অনেক মানুষের কাছে চিকিৎসা এখনো একটি কঠিন বাস্তবতা। দুর্গম পথ, অর্থনৈতিক সংকট এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবার সীমাবদ্ধতার কারণে বছরের পর বছর অনেক মানুষ নানা রোগে ভুগলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পান না। বিশেষ করে ছানি রোগে আক্রান্ত অসংখ্য মানুষ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেন দৃষ্টিশক্তি। অথচ সময়মতো চিকিৎসা পেলে তাদের জীবন আবারও ফিরে পেতে পারে আলোর স্পর্শ।
এমন বাস্তবতায় মানবিক দায়িত্ববোধ ও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মহালছড়ি জোন। তাদের উদ্যোগে পাহাড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ৮৪ জন ছানি রোগী চিকিৎসা ও অপারেশনের মাধ্যমে নতুন করে পৃথিবীর আলো দেখার সুযোগ পেয়েছেন।
সেনাবাহিনীর সূত্রে জানা যায়, গত ৭ মার্চ মহালছড়ি জোনের উদ্যোগে একটি বৃহৎ বিনামূল্যের চক্ষু ও সাধারণ চিকিৎসা ক্যাম্প আয়োজন করা হয়। ওই ক্যাম্পে প্রায় ১ হাজার ২৫ জন রোগী চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে পাঁচ শতাধিক ছিলেন চক্ষুরোগী।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে রোগীদের চোখ পরীক্ষা করে ১২৭ জনকে ছানি অপারেশনের জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়। পাশাপাশি ১০০ জন রোগীকে বিনামূল্যে চশমা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ করা হয়। পরবর্তীতে ১২ মে আরও ৬০ জন রোগীর মাঝে বিনামূল্যে চশমা বিতরণ করা হয়।
এরপর শুরু হয় ক্যাম্পেইনের দ্বিতীয় ধাপ। তালিকাভুক্ত রোগীদের মধ্যে যারা স্বেচ্ছায় ছানি অপারেশনে আগ্রহ প্রকাশ করেন, তাদের জন্য সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ক্যাটারাক্ট (ছানি) সার্জারির ব্যবস্থা করে মহালছড়ি জোন।
মহালছড়ি জোনের রেজিমেন্টাল মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) ক্যাপ্টেন মো. বোরহান উদ্দিন বায়েজিদ জানান, গত ৬ জুন মহালছড়ি জোনের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় মোট ১০৬ সদস্যের একটি দল চট্টগ্রামের লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালের উদ্দেশে যাত্রা করে। তাদের মধ্যে ৮৪ জন ছিলেন ছানি রোগী এবং ২২ জন ছিলেন সহায়ক স্বজন বা অ্যাটেনডেন্ট। রোগীদের মধ্যে ৪৫ জন নারী ও ৩৯ জন পুরুষ ছিলেন।
দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকার রোগীদের কথা বিবেচনা করে যাতায়াতের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। অপারেশনের আগে রোগী ও তাদের সহযাত্রীদের মহালছড়ি শিশুমঞ্চ উচ্চ বিদ্যালয়ে একত্রিত করা হয়। সেখান থেকে তিনটি বাসে করে তাদের চট্টগ্রামের উদ্দেশে পাঠানো হয়। দীর্ঘ যাত্রাপথে রোগী ও সহযাত্রীদের জন্য খাবার ও হালকা নাস্তার ব্যবস্থাও করে মহালছড়ি জোন।
শুধু পরিবহন ব্যবস্থাই নয়, পুরো কার্যক্রমের নিরাপত্তা, সমন্বয় ও সার্বিক তত্ত্বাবধান নিশ্চিত করতে সাত সদস্যের একটি সেনা দল রোগীদের সঙ্গে প্রেরণ করা হয়। এই দলটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে এবং রোগীদের প্রতিটি প্রয়োজনীয় বিষয়ে সহযোগিতা প্রদান করে।
চট্টগ্রাম লায়ন্স চক্ষু হাসপাতালে পৌঁছানোর পর রোগীদের বিস্তারিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং সম্পন্ন করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ৮৪ জনের মধ্যে ৭৬ জন রোগীকে অপারেশনের জন্য উপযুক্ত ঘোষণা করা হয়। চিকিৎসাগত কারণে বাকি রোগীদের পরবর্তীতে অপারেশনের জন্য নতুন তারিখ দেওয়া হয়।
নির্বাচিত ৭৬ জন রোগীর সফলভাবে ছানি অপারেশন সম্পন্ন হয়। অপারেশনের পর রোগীদের থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তবে সঙ্গে থাকা ২২ জন অ্যাটেনডেন্টের জন্য খাবারের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তাদের খাবারের সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে মহালছড়ি জোন।
অপারেশন-পরবর্তী সময়ে রোগীদের চিকিৎসা, নিরাপত্তা, থাকা-খাওয়া এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সেনা সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করেন। ফলে রোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা স্বস্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে পুরো চিকিৎসা প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সক্ষম হন।
সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্ত ছিল অপারেশনের পরের সময়। দীর্ঘদিন ঝাপসা দৃষ্টিতে পৃথিবী দেখা মানুষগুলো যখন আবার স্পষ্টভাবে চারপাশ দেখতে শুরু করেন, তখন তাদের চোখেমুখে ফুটে ওঠে আনন্দ, বিস্ময় ও কৃতজ্ঞতার অনন্য প্রকাশ। কারও কাছে এটি বহু বছর পর পৃথিবীকে নতুন করে দেখার সুযোগ, আবার কারও কাছে নতুন জীবনের শুরু।
একজন বয়োজ্যেষ্ঠ রোগী আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “অনেক বছর ধরে চোখে ঠিকমতো দেখতে পারতাম না। মনে হতো জীবনের আলো নিভে যাচ্ছে। আজ আবার পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছি। মনে হচ্ছে নতুন জীবন ফিরে পেয়েছি।”
চিকিৎসা কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর ৮ জুন রোগী ও তাদের সহযাত্রীদের নিরাপদে নিজ নিজ এলাকায় পৌঁছে দেওয়া হয় সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে। বাড়ি ফেরার পথে তাদের হাসিমুখ, পরস্পরের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি এবং নতুন আশায় উজ্জীবিত হয়ে ওঠার দৃশ্য যেন এই মানবিক উদ্যোগের সার্থকতার সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে ওঠে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের মতো দুর্গম অঞ্চলে এমন উদ্যোগ শুধু স্বাস্থ্যসেবা প্রদান নয়; বরং সামাজিক দায়বদ্ধতা ও মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। মহালছড়ি জোনের এই কার্যক্রম প্রমাণ করেছে, আন্তরিক উদ্যোগ ও সমন্বিত প্রচেষ্টা থাকলে পাহাড়ের প্রত্যন্ত মানুষের কাছেও পৌঁছে দেওয়া সম্ভব উন্নত চিকিৎসাসেবা।
মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও জনসেবার অনন্য সমন্বয়ে মহালছড়ি জোন শুধু ছানি অপারেশন করায়নি; বরং বহু মানুষের জীবনে ফিরিয়ে দিয়েছে হারিয়ে যাওয়া আলো, নতুন স্বপ্ন এবং বেঁচে থাকার নতুন প্রেরণা। পাহাড়ের অনেক পরিবারের কাছে এই উদ্যোগ তাই শুধু একটি চিকিৎসা কর্মসূচি নয়, বরং অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার এক অবিস্মরণীয় যাত্রা।

