“ভাষা একটি জাতির আত্মপরিচয়, ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে রফিক, সালাম, বরকত, জব্বারসহ অসংখ্য ভাষা শহীদের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষা তার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করেছে। সেই চেতনা থেকেই প্রতিটি মাতৃভাষার সংরক্ষণ ও বিকাশ সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।”
খাগড়াছড়ি রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম ওবায়দুল হকের এই বক্তব্য যেন শুধু একটি আনুষ্ঠানিক ভাষণ নয়, বরং পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার এক সুস্পষ্ট অঙ্গীকার।
পার্বত্য অঞ্চলের ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমা জনগোষ্ঠীর মাতৃভাষা সংরক্ষণ, চর্চা এবং নতুন প্রজন্মের মধ্যে ভাষাগত বৈচিত্র্যের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি করতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছে খাগড়াছড়ি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়েছে ত্রিপুরা, চাকমা ও মারমা ভাষা শিক্ষা ক্লাব, যা পার্বত্য অঞ্চলে মাতৃভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সোমবার (২০ জুলাই) সকাল ১১টায় কলেজের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তিনটি ভাষা শিক্ষা ক্লাবের উদ্বোধন করেন খাগড়াছড়ি রিজিয়নের রিজিয়ন কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম ওবায়দুল হক।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরাসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এসব ভাষা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শেখার পর্যাপ্ত সুযোগ ছিল না। কেবল মুখে মুখে ভাষার চর্চা চলতে থাকলে একসময় ভাষার লিখিত রূপ, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। তাই নতুন প্রজন্মকে মাতৃভাষার স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ এবং লিখনপদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করানো এখন সময়ের দাবি।
তিনি আরও বলেন, এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শুধু ভাষা শেখানো নয়; বরং বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা
মাতৃভাষাগুলোকে টিকিয়ে রাখা এবং শিশু-কিশোরদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত করা। বর্তমান প্রজন্ম মাতৃভাষায় দক্ষ হয়ে উঠলে ভবিষ্যতে শিক্ষা, গবেষণা, সাহিত্যচর্চা এবং পেশাগত ক্ষেত্রেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কে এম ওবায়দুল হক জানান, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পরিচালিত ও তত্ত্বাবধানে থাকা বিদ্যালয়গুলোতে মাতৃভাষা শিক্ষা কার্যক্রম ধারাবাহিকভাবে চালু থাকবে। একই সঙ্গে তিনি জেলা ও উপজেলা শিক্ষা প্রশাসন এবং সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতি নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে মাতৃভাষা শিক্ষা চালুর উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।
কলেজ কর্তৃপক্ষ জানায়, নবগঠিত তিনটি ভাষা শিক্ষা ক্লাবের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিটি জাতিসত্তা থেকে পৃথক প্রশিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হবে। সপ্তাহে একদিন করে নির্ধারিত শ্রেণি কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ মাতৃভাষার বর্ণমালা, উচ্চারণ, লিখনরীতি ও ভাষার মৌলিক কাঠামো শিখতে পারবে। এর মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশে মাতৃভাষা শিক্ষার একটি কার্যকর ভিত্তি গড়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, বিশ্বায়নের এই সময়ে ছোট ছোট ভাষাগুলো নানা কারণে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এমন বাস্তবতায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক মাতৃভাষা শিক্ষা উদ্যোগ শুধু ভাষা সংরক্ষণই নয়, বরং পার্বত্য অঞ্চলের বহুসাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
অনুষ্ঠানে খাগড়াছড়ি ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুহাম্মদ আতিকুল হক, জোন কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল আমিনুর রহমান, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবক এবং বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিলেন।
পার্বত্য অঞ্চলের ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে এই উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের মধ্যে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা, আত্মপরিচয়ের বোধ এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষার দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা।

