একটি বিদ্যালয়েও কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি—এমন তিনটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে খাগড়াছড়িতে। চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এবারের এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর জেলার শিক্ষা ব্যবস্থার চিত্রে এমন হতাশাজনক তথ্য উঠে এসেছে। একই সঙ্গে উপজেলা ভিত্তিক ফলাফলেও দেখা দিয়েছে বড় ধরনের পার্থক্য। কোথাও পাসের হার ৪০ শতাংশ ছাড়ালেও কোনো কোনো উপজেলায় তা নেমে এসেছে ২৩ শতাংশের নিচে।
জেলা পর্যায়ে স্কুল ও মাদ্রাসা মিলিয়ে খাগড়াছড়ির সম্মিলিত পাসের হার ৩৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। বিপরীতে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সামগ্রিক পাসের হার ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। অর্থাৎ বোর্ডের গড় ফলাফলের চেয়ে খাগড়াছড়ির সম্মিলিত পাসের হার প্রায় ২২ শতাংশীয় পয়েন্ট কম।
শুধু ফলাফলের ব্যবধান নয়, জেলার তিনটি বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষার্থীই পাস না করার ঘটনা দুর্গম পাহাড়ি এলাকার শিক্ষা-বাস্তবতা, শিক্ষার্থীদের অনিয়মিত উপস্থিতি, যোগাযোগ সংকট এবং অভিভাবকদের সচেতনতার ঘাটতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
তিন বিদ্যালয়ে শূন্য পাস:
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের অধীনে খাগড়াছড়ির জারুলছড়ি হেডম্যানপাড়া হাই স্কুল, তারাবনিয়া হাই স্কুল ও ভাইবোনছড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অংশ নেওয়া কোনো শিক্ষার্থীই এবার এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
তবে ভাইবোনছড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের নয় পরীক্ষার্থীর মধ্যে চারজন পাস করেছে। প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে অংশ নেওয়া ১৬ পরীক্ষার্থীর কেউই উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ভাইবোনছড়া বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাধন চন্দ্র চাকমা বলেন, জেনারেল ও ভোকেশনাল মিলিয়ে তাঁদের বিদ্যালয়ের মোট পরীক্ষার্থী ছিল ২৫ জন। এর মধ্যে চারজন উত্তীর্ণ হয়েছে।
তিনি বলেন, দুর্বল শিক্ষার্থীদের বিষয়ে তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে আগে থেকেই যোগাযোগ করা হয়েছিল। দুর্বল বিষয়গুলোতে বিশেষ নজর দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন হলে শিক্ষক দিয়ে এবং নিজে দায়িত্ব নিয়ে পড়ানোর কথাও জানানো হয়েছিল। কিন্তু অনেক অভিভাবক প্রত্যাশিত সহযোগিতা না করায় কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জন সম্ভব হয়নি।
উপজেলা ভিত্তিক ফলাফলে বড় বৈষম্য:
খাগড়াছড়ির আট উপজেলার স্কুল পর্যায়ের ফলাফলেও দেখা গেছে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান। জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ পাসের হার মানিকছড়িতে—৪০ দশমিক ২১ শতাংশ। এরপর রয়েছে রামগড়, লক্ষ্মীছড়ি ও মাটিরাঙ্গা।
অন্যদিকে সবচেয়ে কম পাসের হার দীঘিনালায়—২২ দশমিক ৮৪ শতাংশ।
উপজেলা ভিত্তিক স্কুলের ফলাফল হলো—উপজেলা পাসের হার:
মানিকছড়ি-৪০.২১%,রামগড়-৩৪.৬৬%,লক্ষ্মীছড়ি
-৩৪.১৯%,মাটিরাঙ্গা-৩২.১৮%,পানছড়ি-৩১.৫২%
গুইমারা-৩১.১২%,মহালছড়ি-২৯.৬৩%,দীঘিনালা-
২২.৮৪%। অর্থাৎ জেলার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন পাসের হারের মধ্যে ব্যবধান প্রায় ১৭ দশমিক ৩৭ শতাংশীয় পয়েন্ট।
জেলা ও বোর্ডের ফলাফলে বড় ব্যবধান:
জেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, এবারের এসএসসি পরীক্ষায় খাগড়াছড়ির বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে অংশ নেয় ৭ হাজার ৭৭৮ জন পরীক্ষার্থী। উত্তীর্ণ হয়েছে ২ হাজার ৭৬৬ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৯০ জন।
অন্যদিকে মাদ্রাসা থেকে পরীক্ষায় অংশ নেয় ৭৬৮ জন। এর মধ্যে পাস করেছে ৪০০ জন। মাদ্রাসা পর্যায়ে পাসের হার ৫২ দশমিক ০৮ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ছয়জন।
স্কুল ও মাদ্রাসা মিলিয়ে খাগড়াছড়িতে মোট পরীক্ষার্থী ৮ হাজার ৫৪৬ জন। উত্তীর্ণ হয়েছে ৩ হাজার ১৬৬ জন। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১৯৬ জন। ফলে জেলায় এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সম্মিলিত পাসের হার ৩৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। অন্যদিকে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের সামগ্রিক পাসের হার ৫৯ দশমিক ৪৮ শতাংশ। বোর্ডের গড়ের তুলনায় খাগড়াছড়ির সম্মিলিত ফলাফল তাই অনেকটাই পিছিয়ে।
কেন এমন ফল?
শিক্ষকদের মতে, খাগড়াছড়ির দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বাস্তবতা শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে বড় প্রভাব ফেলে। অনেক শিক্ষার্থীকে দূর-দূরান্তের এলাকা থেকে প্রতিদিন বিদ্যালয়ে আসতে হয়। কোথাও পাহাড়ি পথ, কোথাও দীর্ঘ যাতায়াত; বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে।
ভাইবোনছড়া মিলেনিয়াম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাতুমনি চাকমা বলেন, তাঁদের বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন দূর-দূরান্তের এলাকা থেকে আসে। অনেক অভিভাবক সচেতন না হওয়ায় শিক্ষার্থীরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত হতে পারে না। দূরত্ব ও যাতায়াতের সমস্যার কারণেও পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৬ সালের পরীক্ষার্থীদের অনেকের পড়াশোনায় কিছুটা ছন্দপতন হয়েছে। নতুন ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যালয়ের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে সময় লেগেছে। এসব বিষয় মিলিয়ে এবার ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
শুধু বিদ্যালয় নয়, পরিবারেরও দায়িত্ব
শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্গম এলাকার অনেক পরিবারের আর্থসামাজিক বাস্তবতার কারণে সন্তানদের পড়াশোনায় নিয়মিত তদারকি করা সম্ভব হয় না। কোনো কোনো পরিবারে বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা, ঘরের কাজ এবং পড়াশোনার মধ্যে ভারসাম্য রাখাও কঠিন হয়ে পড়ে।
অভিভাবকরা জানান, পাহাড়ি এলাকায় সন্তানকে নিয়মিত বিদ্যালয়ে পাঠানোই অনেক সময় বড় চ্যালেঞ্জ। দীর্ঘ দূরত্ব, যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং বর্ষায় সড়ক-পাহাড়ি পথের দুরবস্থার কারণে উপস্থিতি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে একই সঙ্গে অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উঠে এসেছে। সন্তান বিদ্যালয়ে নিয়মিত যাচ্ছে কি না, বাড়িতে পড়াশোনা করছে কি না এবং কোন বিষয়ে দুর্বল—এসব বিষয়ে পরিবারের নজরদারি বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শূন্য পাসের কারণ খতিয়ে দেখবে শিক্ষা অফিস:
খাগড়াছড়ি জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতি. দা.) সুভাষ চন্দ্র সিকদার বলেন, যেসব প্রতিষ্ঠান থেকে কোনো শিক্ষার্থী পাস করেনি, সেসব প্রতিষ্ঠানের ফলাফল পর্যালোচনা করা হবে।
তিনি জানান, শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ফলাফল শুধু সংখ্যা নয়:
চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের প্রায় ৬০ শতাংশ পাসের বিপরীতে খাগড়াছড়িতে সম্মিলিত পাসের হার ৩৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। এর মধ্যে আবার উপজেলার ফলাফলে রয়েছে বড় ব্যবধান—মানিকছড়িতে ৪০ দশমিক ২১ শতাংশ থেকে দীঘিনালায় নেমে এসেছে ২২ দশমিক ৮৪ শতাংশে।
তিনটি বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষার্থীও পাস না করার ঘটনা তাই কেবল পরীক্ষার ফলাফলের একটি পরিসংখ্যান নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পাহাড়ি জনপদের শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে পৌঁছানোর বাস্তবতা, নিয়মিত উপস্থিতি, পরিবার ও বিদ্যালয়ের সমন্বয় এবং শিক্ষার সুযোগ-সুবিধার বৈষম্য।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শূন্য পাস করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে চিহ্নিত করে শুধু প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিলেই হবে না। প্রতিটি বিদ্যালয়ের বিষয়ভিত্তিক ফলাফল, শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি, শিক্ষকসংকট, ঝরে পড়ার হার, অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা এবং দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা আলাদাভাবে বিশ্লেষণ করতে হবে।
প্রয়োজনে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ক্লাস, নিয়মিত অভিভাবক সভা, বিদ্যালয়ভিত্তিক মনিটরিং এবং দুর্গম এলাকার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করতে হবে। কারণ একটি পরীক্ষায় শূন্য পাস হয়তো একটি বছরের ফলাফল। কিন্তু এর পেছনের কারণগুলো চিহ্নিত করে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই শূন্যতা ভবিষ্যতের শিক্ষাজীবনেও দীর্ঘ ছায়া ফেলতে পারে।

