পাহাড়ের সবুজ প্রান্তরে আবারও গর্জে উঠেছে নারী ফুটবলের উচ্ছ্বাস। “নারীর ক্ষমতায়ন, খেলাধুলায় অগ্রযাত্রায়” প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে খাগড়াছড়িতে শুরু হয়েছে মাসব্যাপী প্রমীলা ফুটবল টুর্নামেন্ট-২০২৬।
বাংলাদেশ ত্রিপুরা যুব কল্যাণ সংসদ (বিটিজেকেএস)-এর আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের সম্ভাবনাময় ছয়টি নারী ফুটবল দল।
উদ্বোধনী ম্যাচেই দর্শকরা উপভোগ করেছেন টানটান উত্তেজনা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ লড়াই। খাগড়াছড়ির বিটিজেকেএস প্রমীলা ফুটবল একাডেমি মুখোমুখি হয় রাঙ্গামাটির সুইহলামং ফুটবল একাডেমির। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে দুই দল।
ম্যাচের ১০ মিনিটের মাথায় প্রথম গোল করে এগিয়ে যায় সুইহলামং ফুটবল একাডেমি। গোল হজমের পর একাধিক আক্রমণ চালিয়েও সমতায় ফিরতে পারেনি বিটিজেকেএস। ফলে ১-০ গোলের ব্যবধানে এগিয়ে থেকেই বিরতিতে যায় রাঙ্গামাটির দলটি।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতেই দারুণ প্রত্যাবর্তন করে বিটিজেকেএস। প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়ে ম্যাচে সমতা ফেরায় স্বাগতিকরা। তবে ম্যাচের শেষ মুহূর্তে আরও একটি গোল করে জয় নিশ্চিত করে সুইহলামং ফুটবল একাডেমি। নির্ধারিত সময় শেষে ২-১ গোলের জয় নিয়ে টুর্নামেন্টে শুভ সূচনা করে রাঙ্গামাটির প্রতিনিধিরা।
টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী অন্য দলগুলো হলো— হিল ক্রাউন ফুটবল একাডেমি, পার্বত্য ফুটবল একাডেমি, খাগড়াছড়ি ফুটবল একাডেমি ও মাটিরাঙ্গা ফুটবল একাডেমি।
ম্যাচ শেষে বিজয়ী দলের অধিনায়ক বলেন, “এই জয় আমাদের জন্য বড় অনুপ্রেরণা। পাহাড়ের মেয়েরা এখন আর পিছিয়ে নেই। আমরা চাই জাতীয় দলে খেলে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আরও গর্বিত করতে।”
অন্যদিকে বিটিজেকেএস প্রমীলা ফুটবল একাডেমির এক খেলোয়াড় বলেন, “আজ আমরা হেরেছি, কিন্তু লড়াই করেছি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত। এই টুর্নামেন্ট আমাদের দক্ষতা বাড়ানোর বড় সুযোগ। আগামী ম্যাচগুলোতে ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় রয়েছে।”
মোবাইল আসক্তি থেকে মাঠমুখী করার উদ্যোগ’
আয়োজকরা জানান, বর্তমান সময়ে কিশোরীদের মোবাইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার থেকে দূরে রেখে খেলাধুলামুখী করে তুলতেই প্রতিবছর এই আয়োজন করা হয়।
বাংলাদেশ ত্রিপুরা যুব কল্যাণ সংসদের নেতারা বলেন,
“পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা একটি শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পার্বত্য অঞ্চলের মেয়েদের প্রতিভা বিকাশ ও জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরার লক্ষ্যেই আমাদের এই উদ্যোগ। আমরা চাই পাহাড়ের মেয়েরা একদিন দেশের জার্সি গায়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও খেলুক।”
অতিথিদের অনুপ্রেরণামূলক বক্তব্য বাংলাদেশ ত্রিপুরা যুব কল্যাণ সংসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি ও টুর্নামেন্টের ভাইস প্রেসিডেন্ট নবলেশ্বর ত্রিপুরা লায়ন বলেন, “নারী উন্নয়ন ও ক্রীড়ার বিকাশকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে এই টুর্নামেন্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। খেলাধুলা আত্মবিশ্বাস, নেতৃত্ব ও শৃঙ্খলা শেখায়। পাহাড়ের মেয়েরা সেই যোগ্যতা রাখে, শুধু প্রয়োজন সুযোগের।”
বাফুফে কোচ তুহিন কুমার দে বলেন, “পার্বত্য অঞ্চলে নারী ফুটবলের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এখানকার মেয়েদের গতি, শারীরিক সক্ষমতা ও খেলার প্রতি আগ্রহ জাতীয় দলের জন্য বড় সম্পদ হতে পারে। নিয়মিত টুর্নামেন্ট আয়োজন হলে এখান থেকে আরও অনেক ফুটবলার জাতীয় পর্যায়ে উঠে আসবে।”
জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের জেলা সভাপতি কুহেলী দেওয়ান বলেন,“মেয়েদের ক্ষমতায়নের সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যমগুলোর একটি হলো খেলাধুলা। মাঠে মেয়েদের অংশগ্রহণ সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তনের বার্তা দেয়।”
জেলা প্রমীলা ফুটবল কোচ জ্যোতিষ বসু ত্রিপুরা বলেন,
“এই টুর্নামেন্ট শুধু প্রতিযোগিতা নয়, এটি নতুন খেলোয়াড় খুঁজে বের করার একটি প্ল্যাটফর্ম। এখানকার অনেক খেলোয়াড় ভবিষ্যতে জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে।”
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে নবলেশ্বর ত্রিপুরা লায়নের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন খাগড়াছড়ি ফুটবল এসোসিয়েশনের আহ্বায়ক তুহিন কুমার দে, জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের জেলা সভাপতি কুহেলী দেওয়ান, বি.কে. স্মৃতি সংসদের সভাপতি পুলক নারায়ন রোয়াজা, ঠাকরছড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অনক বরন ত্রিপুরা, জেলা প্রমীলা ফুটবল কোচ জ্যোতিষ বসু ত্রিপুরা, ক্রীড়া সংগঠক সূর্যব্রত ত্রিপুরা, বিটিজেকেএসের সাধারণ সম্পাদক জয় প্রকাশ ত্রিপুরাসহ ক্রীড়াঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

