পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসতেই পাহাড়ি জেলা খাগড়াছড়ির কোরবানির পশুর হাটগুলো এখন প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর। সকাল গড়াতেই হাটজুড়ে ভেসে আসে গরুর ডাক, ক্রেতা-বিক্রেতার দরদাম আর ব্যস্ত পদচারণা। শেষ মুহূর্তের কেনাবেচায় জমে উঠেছে জেলার ২৬টি পশুর হাট। পাহাড়ি প্রাকৃতিক পরিবেশে অর্গানিক উপায়ে বেড়ে ওঠা গরুকে ঘিরে এবারও ক্রেতাদের আগ্রহ চোখে পড়ার মতো।
জেলার ৯টি উপজেলা—খাগড়াছড়ি সদর, মাটিরাঙ্গা, গুইমারা, পানছড়ি, লক্ষ্মীছড়ি, রামগড়, মানিকছড়ি, মহালছড়ি ও দীঘিনালায় বসেছে মোট ২৬টি পশুর হাট। এরমধ্যে ১৮টি স্থায়ী ও ৮টি অস্থায়ী বাজার। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে কেনাবেচা। কেউ গরুর দাঁত দেখে বয়স মিলাচ্ছেন, কেউ শরীরের গঠন দেখে দরদাম করছেন, আবার কেউ পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পছন্দের পশু খুঁজে বেড়াচ্ছেন।
খাগড়াছড়ির বিভিন্ন পারিবারিক ও বাণিজ্যিক খামারে লালন-পালন করা হয়েছে ১৮ হাজারেরও অধিক কোরবানির গরু। এখানকার খামারিরা বলছেন, পাহাড়ের গরু সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে বেড়ে ওঠে।
মোটাতাজাকরণের জন্য কোনো ধরনের ক্ষতিকর ঔষধ বা রাসায়নিক ব্যবহার করা হয় না। পাহাড়ি ঘাস, খড় ও দেশীয় খাদ্যেই লালন করা হয় এসব পশু। আর সেই কারণেই পাহাড়ি গরুর মাংসের স্বাদ ও গুণগত মান নিয়ে ক্রেতাদের আস্থা দিন দিন বাড়ছে।
এক খামারি বলেন, “আমরা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে গরু পালন করি। কোনো ধরনের ক্ষতিকর ঔষধ ব্যবহার করি না। পাহাড়ের গরুর মাংসও ভালো হয়। তাই ক্রেতাদের আগ্রহ বেশি থাকে। তবে খাবার আর শ্রমিকের খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভ খুব বেশি থাকছে না।”
বাজার ঘুরে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও অনেক ক্রেতা এসেছেন পাহাড়ি গরু কিনতে। তাদের মতে, পাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবে পালন করা গরু তুলনামূলক বেশি সুস্থ ও নিরাপদ। তাই দাম কিছুটা বেশি হলেও ভালো পশু কিনতেই আগ্রহী তারা।
এক ক্রেতা জানান, “আমরা চেষ্টা করছি সুস্থ ও ভালো গরু কেনার। পাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবে পালন করা হয় বলে এখানকার গরুর প্রতি আস্থা বেশি। দাম একটু বেশি হলেও ভালো গরুই নিতে চাই।”
গরুর ব্যবসায়ীরাও বলছেন, ঈদ যত ঘনিয়ে আসছে, বাজারের জমজমাট পরিবেশও তত বাড়ছে।
এক ব্যবসায়ী বলেন, “খাগড়াছড়ির পাহাড়ের গরুর আলাদা একটা চাহিদা আছে। অনেক ক্রেতা দূর-দূরান্ত থেকে আসে। শেষ মুহূর্তে বাজার আরও জমে উঠছে।”
এদিকে হাটের সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করছে প্রশাসন। ইজারাদার জালাল উদ্দিন বলেন,
“এবার হাটে পর্যাপ্ত গরু উঠেছে। ক্রেতা-বিক্রেতারা যেন স্বস্তিতে বেচাকেনা করতে পারেন সেজন্য নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় আমরা কাজ করছি।”
খাগড়াছড়ি জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আলী আজম জানান, “জেলায় ১৮ হাজারের অধিক কোরবানির গরু মজুদ রয়েছে। কোরবানি নিয়ে কোনো সংকটের সম্ভাবনা নেই। খামারি ও কসাইদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।”
খাগড়াছড়ির পুলিশ সুপার মো. মোরতোজা আলী খান বলেন, “জেলায় ২৬টি পশুর হাট বসেছে। এরমধ্যে ১৮টি স্থায়ী ও ৮টি অস্থায়ী পশুর হাট রয়েছে। এসব হাটকে কেন্দ্র করে পুলিশ প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। ৪০৪ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়াও অজ্ঞান পার্টি, মলম পার্টি, ছিনতাইকারী কিংবা অর্থ ছিনতাই ঠেকাতে গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়ানো হয়েছে।”
প্রাকৃতিক পরিবেশে অর্গানিক উপায়ে লালন-পালন হওয়ায় খাগড়াছড়ির পাহাড়ি গরুর চাহিদা প্রতি বছরই বাড়ছে। আর ঈদ যত কাছে আসছে, ততই প্রাণ ফিরে পাচ্ছে পাহাড়ি জনপদের কোরবানির পশুর হাট। পাহাড়ের সবুজ প্রকৃতি আর মানুষের উচ্ছ্বাস মিলিয়ে এখন খাগড়াছড়ির হাটগুলো যেন ঈদের আগাম উৎসবের রূপ নিয়েছে।

