পাহাড়ের একটি শ্রেণিকক্ষ থেকে শুরু হয়েছিল তাঁর প্রতিদিনের পাঠদান। সেই শ্রেণিকক্ষের জ্ঞান, মূল্যবোধ ও স্বপ্ন এবার পৌঁছেছে জাতীয় মঞ্চে। শিক্ষকতার দীর্ঘ পথচলায় অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন গড়ার স্বীকৃতি হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে গুণী শিক্ষক সম্মাননা পেয়েছেন খাগড়াছড়ি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক চম্পানন চাকমা।
বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে সোমবার (৫ অক্টোবর) রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে আয়োজিত আলোচনা সভা ও গুণী শিক্ষক সম্মাননা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাত থেকে তিনি এ সম্মাননা গ্রহণ করেন। পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষক হিসেবে জাতীয় পর্যায়ে এমন স্বীকৃতি পাওয়ায় খাগড়াছড়ির শিক্ষাঙ্গনে তৈরি হয়েছে গর্ব ও আনন্দের আবহ।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ড. এহসানুল হক মিলন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ এমপি, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি মো. সেলিম ভূঁইয়া এমপি এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল খালেক।
জাতীয় স্বীকৃতির তালিকায় পাহাড়ের একজন শিক্ষক
৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্তরের নির্বাচিত ১০২ জন গুণী শিক্ষককে জাতীয়ভাবে সম্মাননা দেওয়া হয়। প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা, কৃষি, প্রকৌশল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ শিক্ষার বিভিন্ন স্তর থেকে তাঁদের নির্বাচন করা হয়।
এর মধ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে নির্বাচিত ২০ জন শিক্ষকের মধ্যে সাধারণ মাধ্যমিক পর্যায়ের জন্য নির্বাচিত ১০ জন গুণী শিক্ষকের একজন হিসেবে স্থান পান চম্পানন চাকমা।
জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির যাচাই-বাছাই ও নির্বাচন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গুণী শিক্ষকদের চূড়ান্ত করা হয়। সম্মাননা হিসেবে প্রত্যেক শিক্ষককে প্রাইজমানির চেক ও সম্মাননা স্মারক হিসেবে ক্রেস্ট প্রদান করা হয়।
চম্পানন চাকমার এই অর্জনের বিশেষত্ব এখানেই,জাতীয় পর্যায়ের এই স্বীকৃতির মঞ্চে তিনি শুধু একজন শিক্ষক হিসেবে নয়, পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষাক্ষেত্রের প্রতিনিধিত্বকারী একজন শিক্ষক হিসেবেও উঠে এসেছেন।
‘এই সম্মাননা আমার একার নয়’
জাতীয় পর্যায়ের এই স্বীকৃতি পাওয়ার পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে চম্পানন চাকমা বলেন, “এটি আমার শিক্ষকতা জীবনের এক অত্যন্ত আনন্দঘন, গৌরবময় ও স্মরণীয় মুহূর্ত। এ সম্মাননা আমার একার নয়; এটি আমার পরিবার, বাবা-মা, সহকর্মী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি আমার প্রিয় শিক্ষার্থীদের ভালোবাসা, সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণার স্বীকৃতি।”
তিনি এ সম্মাননার জন্য প্রধানমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান।
একই সঙ্গে শিক্ষকতার জীবনে যাঁদের কাছ থেকে জ্ঞান, মূল্যবোধ ও পেশাগত আদর্শ শিখেছেন, তাঁদেরও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি। তাঁর ভাষায়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের সেই শিক্ষকরা তাঁর শিক্ষকতা জীবনের ভিত গড়ে দিয়েছেন।
কৃতজ্ঞতার তালিকায় তিনি রেখেছেন বাবা-মা, পরিবারের সদস্য, সহকর্মী এবং অসংখ্য শিক্ষার্থীকে। তাঁদের ভালোবাসা, সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণাকে নিজের শিক্ষকতা জীবনের অন্যতম বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
‘শিক্ষক শুধু পাঠদান করেন না, মানুষ তৈরি করেন’
চম্পানন চাকমার বক্তব্যে উঠে এসেছে শিক্ষকতার গভীরতর দর্শনও। তাঁর মতে, একটি সমাজের ভবিষ্যৎ নির্মাণে শিক্ষকের ভূমিকা অন্য যেকোনো পেশার চেয়ে ভিন্ন। তিনি বলেন, “একজন চিকিৎসক একজন মানুষের জীবন রক্ষা করেন, একজন প্রকৌশলী ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণ করেন; আর একজন শিক্ষক মানুষ গড়ে তোলেন। সেই মানুষই একজন চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী, প্রশাসক, উদ্যোক্তা কিংবা রাষ্ট্রনায়ক হয়ে দেশ ও সমাজের নেতৃত্ব দেন।”
তাঁর ভাষায়, “তাই শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়—এটি একটি মহান দায়িত্ব, একটি নৈতিক অঙ্গীকার এবং জাতি গঠনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার।”
এই উপলব্ধিই তাঁর শিক্ষকতার দর্শনের মূল জায়গা। শ্রেণিকক্ষে পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মূল্যবোধ, দায়িত্ববোধ ও ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত করে তোলাকেও তিনি শিক্ষকতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হিসেবে দেখেন।
১০২ গুণী শিক্ষকের স্বীকৃতি:
এবার বিশ্ব শিক্ষক দিবসে প্রাথমিক থেকে শুরু করে মাধ্যমিক, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা, কৃষি ও প্রকৌশল শিক্ষার বিভিন্ন পর্যায় থেকে গুণী শিক্ষক নির্বাচন করা হয়।
নির্বাচিত শিক্ষকদের মধ্যে প্রাথমিক পর্যায়ে সাধারণ ও মাদ্রাসা মিলিয়ে ১০ জন, মাধ্যমিক পর্যায়ে সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা মিলিয়ে ২০ জন এবং কলেজ পর্যায়ে সাধারণ, কারিগরি ও মাদ্রাসা মিলিয়ে ২৫ জন শিক্ষক রয়েছেন।
এ ছাড়া সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ২০ জন, চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় ও চিকিৎসা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১০ জন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩ জন এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৩ জন শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৪ জন এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচিত ৬ জন শিক্ষকও এ সম্মাননা পেয়েছেন।
এবারের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য— ‘Standing with Teachers: Sixty Years of Protecting the Profession, Advancing its Status, Shaping Our Futures’।
পাহাড়ের শিক্ষাঙ্গনে নতুন অনুপ্রেরণা:
চম্পানন চাকমার জাতীয় পর্যায়ের এই সম্মাননা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। খাগড়াছড়ির শিক্ষাঙ্গন এবং পার্বত্য অঞ্চলের শিক্ষকসমাজের জন্যও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি।
প্রান্তিক ও পাহাড়ি অঞ্চলে শিক্ষার প্রসার, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নির্মাণ এবং একটি প্রজন্মকে জ্ঞান ও মূল্যবোধে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলার যে দীর্ঘ পথ,চম্পানন চাকমার জাতীয় স্বীকৃতি সেই পথের একজন শিক্ষকের নিষ্ঠারই প্রতিফলন।
পাহাড়ের শ্রেণিকক্ষ থেকে জাতীয় মঞ্চ,চম্পানন চাকমার এই যাত্রা তাই কেবল একজন শিক্ষকের সম্মাননা পাওয়ার গল্প নয়; এটি একজন শিক্ষকের হাতে গড়ে ওঠা অসংখ্য স্বপ্নের জাতীয় স্বীকৃতির গল্প।

