খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের নবনিযুক্ত ১১তম অন্তর্বর্তীকালীন পরিষদের সদস্যদের সততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ব্যারিস্টার মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন। তিনি বলেছেন, জেলা পরিষদের কাজে কোনো ধরনের দুর্নীতি বা অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে এবং সতর্ক করার পরও তা সংশোধন না হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মঙ্গলবার খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের নবনিযুক্ত পরিষদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সৎ, দেশপ্রেমিক ও কর্মঠ ব্যক্তিদের সমন্বয়ে জেলা পরিষদ গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঘোষিত ইশতেহারকে বর্তমান সরকারের কর্মপরিকল্পনার ভিত্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে যারা সহযাত্রী হতে পারবেন, তাদেরই দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এই পরিষদ বা কমিটি স্থায়ী কোনো বিষয় নয়। দায়িত্ব পালনে আপনারা সফল হলে পূর্ণ মেয়াদ দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু কেউ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে কিংবা অনিয়মে জড়িয়ে পড়লে প্রয়োজন হলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে আমরা এক মুহূর্তও দ্বিধা করব না।’
পাহাড়ি-বাঙালি নির্বিশেষে পিছিয়ে থাকা মানুষের কাছে সরকারি সেবা ও উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, শিক্ষা, খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসাসেবার সুযোগ তৈরি করতে হবে। দুর্গম এলাকার যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষার আলো পৌঁছে দেওয়া, নারীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানি, মিনি বা পরিবেশবান্ধব কোল্ড স্টোরেজ, ড্রাই ফ্রুটস ফ্যাক্টরিসহ স্থানীয় প্রয়োজনভিত্তিক প্রকল্প বাস্তবায়নে জেলা পরিষদকে গুরুত্ব দিতে হবে।
আগের কার্যক্রমের অসঙ্গতি আর চলতে দেওয়া হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আগে যেভাবে হয়েছে, সেভাবেই হবে’—এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। প্রতিটি কাজ হতে হবে প্রয়োজনের ভিত্তিতে এবং নিশ্চিত করতে হবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি।
জেলা পরিষদের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে স্থানীয় সংসদ সদস্যের পরামর্শ ও মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার কথাও বলেন প্রতিমন্ত্রী। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে সংসদ সদস্যের মতামত নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে তাঁর মতামত গুরুত্বপূর্ণ।
বাজার ফান্ড প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে সংসদ সদস্যের কাছে পত্র পাঠিয়ে মতামত চাওয়া হবে। সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রীদের মতামতও নেওয়া হবে। জেলা প্রশাসনের মতামত ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। সবার মতামত পাওয়ার পর দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তবে টেন্ডার বা বাজার ফান্ড নিয়ে অতিরিক্ত গুরুত্ব না দিয়ে নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নে মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গবাদিপশু বিতরণ, মসজিদ-মন্দিরের দেয়াল সংস্কারসহ বিভিন্ন খাতে বারবার ফান্ড নেওয়ার বিষয়গুলোও যাচাই-বাছাই করতে হবে। স্থানীয় সংসদ সদস্য ও চেয়ারম্যানের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রকৃত প্রয়োজনীয় কাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
অনিয়মের উদাহরণ তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিভিন্ন জায়গায় হাজার হাজার মেট্রিক টন চাল বিতরণ করা হলেও সঠিক মাস্টাররোল, জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য কিংবা উপকারভোগীর ফোন নম্বর পাওয়া যায় না। এসব সম্পদ কোথায় গেল, তার জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণে বাস্তবতা, বাজারদর ও অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা বিবেচনার তাগিদ দিয়ে তিনি বলেন, বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করে নিম্নমানের কিংবা অতিরিক্ত দামে কোনো পণ্য কেনা যাবে না। জনগণের অর্থের প্রতিটি টাকার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, পাহাড়ি-বাঙালি সব জনগোষ্ঠীর সমান অধিকার, উন্নয়ন ও কল্যাণ নিশ্চিত করাই সরকারের লক্ষ্য। ‘রংধনু জাতি’ গঠনের যে প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
মতবিনিময় সভায় জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ম্রাসাথোয়াই মারমার সভাপতিত্বে আরও উপস্থিত ছিলেন ২৯৮ নম্বর খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস মেহেদী, নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল মাহফুজ, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারিয়া সুলতানা, জেলা পরিষদের সদস্য এম এন আবছারসহ পরিষদের অন্যান্য সদস্য।
এর আগে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের অর্থায়নে মাটিরাঙ্গা নতুনপাড়া জামে মসজিদের ভবন ও তপ্তমাস্টারপাড়া ব্রিজের উদ্বোধন করা হয়। নতুনপাড়া জামে মসজিদ ভবন নির্মাণে প্রকল্প ব্যয় ধরা হয়েছে ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর তপ্তমাস্টারপাড়া ব্রিজ নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ১৮ লাখ ৮৯ হাজার ৮৭০ টাকা।

