বাংলাদেশের তিন পার্বত্য জেলা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই অঞ্চল দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও পর্যটনে অনন্য অবদান রাখলেও এখানকার সাধারণ মানুষের জীবনমান বহুদিন ধরেই পিছিয়ে আছে। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাত সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, এর মূল কারণ জেলা পরিষদগুলোর মনগড়া প্রশাসনিক কাঠামো এবং অকার্যকর পরিচালনা ব্যবস্থা।
-শিক্ষা খাত: শিক্ষক সংকট আর অস্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া:- পার্বত্য অঞ্চলের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট যেন চিরস্থায়ী রূপ নিয়েছে। সরকারি বরাদ্দ থাকলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া জেলা পরিষদগুলোর হাতে থাকায় যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক প্রভাব, সুপারিশ আর পক্ষপাতিত্ব প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলাফল, যোগ্য শিক্ষকরা বঞ্চিত হচ্ছেন, আর অনেক নিযুক্ত শিক্ষক দায়িত্বে অবহেলা করে শহরে অবস্থান করছেন। চলছে মনগড়া শিক্ষক ডেপুটেশন বানিজ্য। কোনো বিদ্যালয়ে নিদিষ্ট পদের সমান সংখ্যক নেই শিক্ষক আবার কোনো বিদ্যালয়ে নিদিষ্ট সংখ্যক পদের বাইরেও ডেপুটেশনে অতিরিক্ত শিক্ষক। এতে বিশেষ করে পিছিয়ে যাচ্ছে শহর অঞ্চলের বাইরে অথাৎ দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়গুলো ও শিক্ষার গুণগত মান। অন্যদিকে, অনেক বিদ্যালয়ে অবকাঠামো নেই বল্লেই চলে। পাহাড়ি দুর্গম এলাকায় শিশুরা দীর্ঘ পথ হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে গিয়ে ঝরে পড়ছে। যে শিক্ষা খাতটি হওয়া উচিত ছিলো আলোকিত ভবিষ্যতের পথপ্রদর্শক, সেটি আজ মনগড়া ব্যবস্থার কারণে দিশেহারা।
-স্বাস্থ্য খাত: কাগজে-কলমে সক্রিয়, বাস্তবে অচল:- স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। জেলার হাসপাতাল বা ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো কাগজে-কলমে সক্রিয় হলেও বাস্তবে ওষুধ সংকট, ডাক্তার-নার্সের অনুপস্থিতি আর যন্ত্রপাতির অচলাবস্থা চরমে পৌঁছেছে। জেলা পরিষদের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া অনেক স্বাস্থ্যকর্মী নিয়মিত উপস্থিত হন না, অথচ মাসের শেষে নিয়মিত বেতন তোলা হয়। তদারকি ব্যবস্থা না থাকায় এসব অনিয়ম বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে। ফলে এখানকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সামান্য চিকিৎসার জন্যও জেলা শহর বা রাজধানীর দিকে ছুটতে হয়, যা সময়, অর্থ ও জীবন, সবকিছুতেই বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।
-কৃষি খাত: বরাদ্দ প্রভাবশালীদের হাতে, বঞ্চিত প্রকৃত কৃষক:- পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি কৃষি। জুম চাষ, সবজি, ফলমূল ও মসলাজাত পণ্যে সমৃদ্ধ এ অঞ্চল দেশের বাজারেও উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। কিন্তু কৃষকরা পাচ্ছেন না পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা। জেলা পরিষদের মাধ্যমে বরাদ্দকৃত বীজ, সার বা প্রশিক্ষণ সুবিধা প্রভাবশালী মহলের হাতে গিয়ে আটকে থাকে। অনেক প্রকল্প শুধু কাগজে বাস্তবায়িত হলেও মাঠপর্যায়ে কোনো প্রভাব পড়ে না। ফলে কৃষকরা উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন, আর স্থানীয় অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়ছে।
-মনগড়া সিস্টেম ও জবাবদিহির সংকট:- সমালোচকদের মতে, জেলা পরিষদগুলোতে কোনো কার্যকর জবাবদিহি নেই। বরাদ্দ এলেও তার ব্যবহার হয় অস্বচ্ছভাবে। মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বল হওয়ায় দুর্নীতি ও অনিয়মই নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রকল্প বাছাই থেকে শুরু করে বাস্তবায়ন পর্যন্ত সর্বত্রই রাজনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষমতাসীনদের স্বার্থ প্রধান হয়ে উঠেছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশিত উন্নয়ন কার্যত অধরাই থেকে যাচ্ছে। এছাড়াও জেলা পরিষদের আওতাধীন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি সহ একাধিক দপ্তরে কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী একই কর্মস্থলে বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ কর্মরত থাকায় স্থানীয় বিভিন্ন সিন্ডিকেটের সাথে সমন্বয় করে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিতে সীমা ছাড়িয়েছে তাঁরা।
-বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতামত:- স্থানীয় গবেষকরা বলছেন, পার্বত্য জেলা পরিষদগুলোর কাঠামো সংস্কার ছাড়া সমাধান সম্ভব নয়। তাদের মতে, শিক্ষাক্ষেত্রে যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ, স্বাস্থ্যসেবায় নিয়মিত মনিটরিং, কৃষিখাতে প্রকৃত কৃষকদের সহায়তা নিশ্চিত করতে হলে কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি তত্ত্বাবধান বাড়াতে হবে। অন্যদিকে, স্থানীয়রা মনে করেন, উন্নয়ন প্রকল্পে জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণ বাড়ানো গেলে অনিয়ম অনেকটাই কমে আসবে। তারা বলেন, “জেলা পরিষদে যারা বসে আছেন তারা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ নন। তাই পাহাড়ে উন্নয়ন নয়, বরং বৈষম্যই বেড়ে চলেছে।”
-অবকাঠামোগত সংস্কারের দাবি:- পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন শুধুমাত্র কাগজে নয়, বাস্তব জীবনেও প্রতিফলিত হওয়া দরকার। বিশেষ করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি এই তিন খাতের ভাঙ্গন যদি রোধ করা না যায়, তবে এই অঞ্চলের জনগণের সামগ্রিক উন্নয়ন অসম্ভব হয়ে পড়বে। মনগড়া সিস্টেমের পরিবর্তে জবাবদিহিমূলক, স্বচ্ছ ও জনমুখী কাঠামো গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। নইলে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ আরও দীর্ঘদিন বৈষম্য আর অবহেলার বোঝা বয়ে বেড়াবে।
_লেখক:-
এম মহাসিন মিয়া, সাংবাদিক ও লেখক। খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা।

