পাহাড়ের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে খাগড়াছড়ির মহালছড়িতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আয়োজনে শুরু হয়েছে ‘সম্প্রীতি ফুটবল কাপ টুর্নামেন্ট-২০২৬’।
রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) বিকেল সাড়ে ৩টায় মহালছড়ি উপজেলা মিনি স্টেডিয়ামে উৎসবমুখর পরিবেশে টুর্নামেন্টের উদ্বোধন করেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ম্রাসাথোয়াই মারমা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মহালছড়ি সেনা জোনের জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল-জাবির আসিফ।
টুর্নামেন্টে মহালছড়ি সেনা জোনের আওতাধীন বিভিন্ন এলাকার ১৬টি দল অংশ নিচ্ছে। উদ্বোধনী ম্যাচে মুখোমুখি হয় মুরাপাড়া একতা ক্লাব ও মানিকছড়ি মুসলিম পাড়া স্পোর্টস একাদশ। উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে মুরাপাড়া একতা ক্লাবকে ১-০ গোলে হারিয়ে পরবর্তী রাউন্ডে জায়গা করে নেয় মানিকছড়ি মুসলিম পাড়া স্পোর্টস একাদশ।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ম্রাসাথোয়াই মারমা বলেন, খেলাধুলা শরীর ও মনকে সুস্থ রাখার পাশাপাশি মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব, শৃঙ্খলা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভ্রাতৃত্ববোধ সৃষ্টি করে। পাহাড়ের বৈচিত্র্যময় সমাজে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য আরও সুদৃঢ় করতে এ ধরনের আয়োজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, প্রাচীন যুগে চীনে ‘কুজু’ নামে ফুটবল খেলা হতো। পরবর্তীতে মধ্যযুগে ইউরোপে ফুটবলের বিস্তার ঘটে। কালের পরিক্রমায় ১৯৩০ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের সূচনা হয়। চলতি বছর আমরা ২৩তম বিশ্বকাপ ফুটবল উপভোগ করেছি। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই এ দেশে ফুটবল জনপ্রিয় ছিল, এখনো এর জনপ্রিয়তা রয়েছে।
ম্রাসাথোয়াই মারমা বলেন, আমাদের পাহাড় থেকেও আনাই মগিনি, আনুচিং, তৃষ্ণা চাকমা, রুপনা চাকমা, ঋদুপর্ণা, মনিকা চাকমাসহ অনেকেই জাতীয় দলে প্রতিনিধিত্ব করেছেন। অঞ্চলভিত্তিক এ ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে আরও অনেক মেধাবী ফুটবলার বেরিয়ে আসবে, যারা একদিন জাতীয় দলে সুযোগ পেয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে।
এ ধরনের আয়োজনের জন্য মহালছড়ি জোনকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, এই টুর্নামেন্টে জয়-পরাজয়ের চেয়েও বড় বিষয় হলো—আমরা সবাই একসঙ্গে মাঠে নামছি, একে অপরকে সম্মান করছি এবং সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও শক্তিশালী করছি। খেলার মাঠে প্রতিযোগিতা থাকবে, হার-জিতও থাকবে; তবে প্রতিপক্ষের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান সবসময় অটুট রাখতে হবে। খেলায় হার-জিতের ঊর্ধ্বে আমাদের বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির জয় নিশ্চিত করতে হবে।
টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী সব দল ও খেলোয়াড়ের সাফল্য কামনা করে জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান বলেন, খেলাধুলার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে আরও এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি পাহাড়ের মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় হবে।
সভাপতির বক্তব্যে মহালছড়ি জোনের জোন অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল-জাবির আসিফ বলেন, মহালছড়িতে ‘সম্প্রীতি ফুটবল কাপ টুর্নামেন্ট-২০২৬’ আয়োজন করতে পেরে তারা অত্যন্ত আনন্দিত। দীর্ঘদিন পর মহালছড়িবাসী এ ধরনের একটি ফুটবল টুর্নামেন্ট উপভোগের সুযোগ পাচ্ছেন। পুরো আয়োজন ঘিরে স্থানীয় জনগণের উৎসাহ-উদ্দীপনা ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণই তাদের জানিয়েছিলেন, মহালছড়িতে দীর্ঘদিন ধরে ফুটবল খেলা নিয়মিত হচ্ছে না। তাদের প্রত্যাশার ধারাবাহিকতায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তরুণরা খেলাধুলায় সম্পৃক্ত হওয়ার পাশাপাশি নিজেদের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ পাবে। এখান থেকেই প্রতিভাবান খেলোয়াড় উঠে এসে জাতীয় অঙ্গনে অবদান রাখবে বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।
লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. আল-জাবির আসিফ বলেন, ‘সম্প্রীতি কাপ’ নামটিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এ আয়োজনের সঙ্গে সবাই আন্তরিকভাবে সম্পৃক্ত হয়েছেন এবং খেলোয়াড়রাও অত্যন্ত স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছেন।
তিনি জানান, টুর্নামেন্ট শেষে মহালছড়ি উপজেলা দল গঠন করা হবে। এবারের প্রতিযোগিতায় ১৬টি দল অংশ নিচ্ছে, যা মহালছড়িতে এ ধরনের আয়োজনে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ। এই ১৬টি দল থেকে ভালো ও প্রতিভাবান খেলোয়াড় বাছাই করে জেলা পর্যায়ের টুর্নামেন্টের জন্য প্রস্তুত করা হবে। সেখানে মহালছড়ি চ্যাম্পিয়ন হবে—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি।
এ ধরনের টুর্নামেন্ট ভবিষ্যতেও চলমান থাকবে জানিয়ে জোন অধিনায়ক বলেন, খেলাধুলার সঙ্গে তরুণ সমাজকে সম্পৃক্ত করা গেলে তারা মাদকসহ বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকবে। খেলাধুলা তরুণদের মধ্যে শৃঙ্খলা ও প্রতিযোগিতার মানসিকতা তৈরি করার পাশাপাশি পারস্পরিক সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধ আরও সুদৃঢ় করে।
তিনি বলেন, খেলাধুলার মাধ্যমে মহালছড়ির যুবসমাজ আরও এগিয়ে যাবে, প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা উঠে আসবে এবং একই সঙ্গে মানুষের মধ্যে সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও শক্তিশালী হবে।

