কয়েক ঘণ্টার প্রবল বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে আকস্মিক বন্যায় খাগড়াছড়ি সদরের বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলসহ জেলার কয়েকটি উপজেলা প্লাবিত হয়েছে। সদরের আরামবাগ, মেহেদীবাগ, শব্দমিয়াপাড়া, কলেজিয়েট উচ্চ বিদ্যালয় এলাকা, খবংপড়িয়া, গঞ্জপাড়া ও কালাডেবাসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে কয়েক হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেক ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন বাসিন্দারা।
খাগড়াছড়ি সদরের পাশাপাশি দীঘিনালা ও মহালছড়ি উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলও পানিতে তলিয়ে গেছে। আকস্মিকভাবে পানি বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও পায়নি। কোথাও ঘরের ভেতর পানি ঢুকেছে, আবার কোথাও সড়কের ওপর দিয়ে প্রবল স্রোতে পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
শুক্রবার রাত থেকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টির পর শনিবার সকালে পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে। মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে এমন আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
খাগড়াছড়ি সদরের নিম্নাঞ্চলে ঘরে ঘরে পানি
সদরের আরামবাগ, মেহেদীবাগ, শব্দমিয়াপাড়া, কলেজিয়েট উচ্চ বিদ্যালয় এলাকা, খবংপড়িয়া, গঞ্জপাড়া, কালাডেবাসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। অনেক পরিবারের বসতঘরের মেঝে পানিতে তলিয়ে গেছে। কেউ কেউ প্রয়োজনীয় মালামাল সরিয়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছেন।
আরামবাগ এলাকার বাসিন্দা বিলকিস বেগম বলেন, রাতে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। সকালে উঠে দেখেন ঘরের ভেতর পানি ঢুকে গেছে। গত মাসের শুরুতে বন্যা হলেও তাঁদের বাড়িতে পানি ওঠেনি। কিন্তু এবার মাত্র কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই ঘরে পানি ঢুকে পড়ায় তাঁরা বিস্মিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।
মুসলিমপাড়া এলাকার বাসিন্দা শাহ আলম বলেন, রাত থেকে ভোর পর্যন্ত থেমে থেমে বৃষ্টি হয়েছে। সকালে উঠে দেখেন আশপাশের শতাধিক বাড়িতে পানি উঠে গেছে। আকস্মিকভাবে পানি বেড়ে যাওয়ায় স্থানীয়রা হতভম্ব হয়ে পড়েছেন।
শাহিনা বেগম বলেন, সকালে হঠাৎ বাড়িতে পানি উঠতে দেখে তাঁরা ঘাবড়ে যান। এমন পরিস্থিতির জন্য তাঁরা মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।
তিন ঘণ্টায় ১০৩ মিলিমিটার বৃষ্টি:
দীঘিনালা আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের বেলুন মেকার সুভূতি চাকমা জানান, শুক্রবার রাত ৯টা থেকে শনিবার সকাল ৬টার মধ্যে প্রায় তিন ঘণ্টায় ১০৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।
স্বল্প সময়ে বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি ছড়া ও নদ-নদীর পানি দ্রুত বেড়ে যায়। এর ফলে বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের সৃষ্টি হয়েছে।
মাইনী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে:
দীঘিনালায় মাইনী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলার মেরুং, কবাখালী ও বোয়ালখালী এলাকার নিচু অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিতে তলিয়ে গেছে বসতবাড়ি ও আমনের ক্ষেত। দীঘিনালা-মেরুং সড়কের ওপর দিয়েও পানি প্রবাহিত হচ্ছে।
বোয়ালখালী ছড়ার পানি বেড়ে জামতলীসহ আশপাশের নিচু এলাকাগুলো প্লাবিত হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, ছড়ার উজানে তৈদুছড়াসহ পাহাড়ি এলাকায় ব্যাপক বৃষ্টিপাতের ফলে পানি দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসে।
বোয়ালখালীর বাসিন্দা গণেশ ত্রিপুরা বলেন, রাতে পরিস্থিতি স্বাভাবিক ছিল। ছড়ায়ও তেমন পানি ছিল না। কিন্তু তিন থেকে চার ঘণ্টা টানা বৃষ্টির পর ছড়ার পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে নিচু এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
পাহাড় ধসে সড়ক যোগাযোগ ব্যাহত:
প্রবল বর্ষণের মধ্যে খাগড়াছড়ি-দীঘিনালা সড়কের কয়েকটি স্থানেও পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটেছে। ৫ মাইল ও ৯ মাইল এলাকায় পাহাড়ের মাটি ধসে পড়ায় প্রায় এক ঘণ্টা যান চলাচল বন্ধ ছিল।
খাগড়াছড়ি সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সৌম্য তালুকদার জানান, ফায়ার সার্ভিস ও সড়ক বিভাগের যৌথ প্রচেষ্টায় ধসে পড়া মাটি সরিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা পর যান চলাচল স্বাভাবিক করা হয়েছে।
মহালছড়িতেও নিম্নাঞ্চল প্লাবিত:
খাগড়াছড়ি সদরের পাশাপাশি মহালছড়ি উপজেলার বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলেও পানি ঢুকে পড়েছে। পাহাড়ি ছড়া ও জলপ্রবাহের পানি বেড়ে বসতবাড়ি ও সড়কে পানি উঠেছে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হয়েছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় একই সময়ে পানি বাড়তে থাকায় বন্যাকবলিত মানুষের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
পানিবন্দি পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়, খাবারের ব্যবস্থা
আকস্মিক জলাবদ্ধতার খবর পাওয়ার পর জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন। পানিবন্দি ও ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাঁদের জন্য দুপুরের খাবারেরও ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
খাগড়াছড়ির জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন, আকস্মিক জলাবদ্ধতার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসন সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছে। নিম্নাঞ্চলের যেসব ঘরবাড়িতে পানি উঠেছে, সেসব পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, পাহাড়ি ঢলের কারণে সাময়িকভাবে এই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে দুপুরের পর থেকে পানি নামতে শুরু করেছে।
তবে স্থানীয়দের আশঙ্কা, পাহাড়ি এলাকায় আবারও ভারী বৃষ্টিপাত হলে নদী ও ছড়ার পানি দ্রুত বেড়ে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। ফলে বন্যাকবলিত ও পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী মানুষের মধ্যে এখনো উৎকণ্ঠা রয়েছে।

