বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের একজন প্রভাষক থেকে শুরু করে সরকারের উপসচিব এবং পরবর্তীতে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর একান্ত সচিব (পিএস) মোহাম্মদ রাশেদুল হকের কর্মজীবন এক অনুপ্রেরণাদায়ক ও বহুমুখী সাফল্যের গল্প। পাহাড়ের চড়াই-উতরাই, শিক্ষাঙ্গনের নিবিড় আবহ এবং জটিল প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে দীর্ঘ সংযোগ তাকে পরিণত করেছে এক দক্ষ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হিসেবে। পেশাগত জীবনের প্রতিটি স্তরে সততা, যোগ্যতা ও মেধার স্বাক্ষর রেখেই তিনি আজকের এ গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন হয়েছেন।
২০০৬ সালের ১ মার্চ বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারে যোগদানের মাধ্যমে রাশেদুল হকের পেশাগত যাত্রার সূচনা হয়। একই বছরের ২ এপ্রিল তিনি ইতিহাস বিষয়ের প্রভাষক হিসেবে খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজে কর্মজীবন শুরু করেন। শিক্ষকতার শুরু থেকেই তিনি পার্বত্য অঞ্চলের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি, সামাজিক বাস্তবতা ও স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার সঙ্গে নিবিড়ভাবে পরিচিত হন।
পরবর্তীতে ২০১৬ সালের ১৪ নভেম্বর তিনি সহকারী অধ্যাপক পদে পদোন্নতি পান এবং রাঙ্গামাটি সরকারি মহিলা কলেজে সুনামের সঙ্গে অধ্যাপনা করেন। জ্ঞান বিতরণ ও শিক্ষাবিস্তার পাশাপাশি পাহাড়ের মানুষের জীবনধারাকে কাছ থেকে দেখার এই সুযোগ তার পরবর্তী প্রশাসনিক জীবনকে ব্যাপকভাবে সমৃদ্ধ করেছে।
শিক্ষাঙ্গনে দক্ষতার পরিচয় দেওয়ার পর তার প্রশাসনিক পথচলা শুরু হয়। ২০১৮ সালের ৮ জুলাই তাকে খাগড়াছড়ির ‘ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী ও অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু বিষয়ক টাস্ক ফোর্স’ কার্যালয়ে নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে প্রেষণে পদায়ন করা হয়। এই সংবেদনশীল ও জটিল দায়িত্ব সামলানোর মধ্য দিয়েই পার্বত্য অঞ্চলের মাঠ প্রশাসনের সঙ্গে তার মূল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন, প্রশাসনিক কাজের সমন্বয় এবং সরকারি নীতি বাস্তবায়নে তিনি অসাধারণ মুনশিয়ানা প্রদর্শন করেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে অর্জিত জ্ঞান ও মাঠ প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা, এ দুয়ের চমৎকার সমন্বয়ে তার ক্যারিয়ার দ্রুত গতি পায়। ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর তিনি ইতিহাস বিষয়ে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। এর কিছুদিন পরই, চলতি বছরের ১৭ আগস্ট, নিজ যোগ্যতা ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে ক্যাডার পরিবর্তনের মাধ্যমে তিনি সরকারের উপসচিব (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন।
তার এই দীর্ঘ ও বর্ণাঢ্য অভিজ্ঞতার চূড়ান্ত মূল্যায়ন ঘটে যখন ২৪ আগস্ট জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সাচিং প্রু জেরি’র একান্ত সচিব (পিএস) হিসেবে পদায়ন করা হয়। জনস্বার্থে অবিলম্বে কার্যকর হওয়া এই আদেশ প্রমাণ করে যে, সরকার তার অর্জিত জ্ঞান ও যোগ্যতার ওপর পূর্ণ আস্থা রেখেছে।
আগামীর সম্ভাবনা: পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল ভৌগোলিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে বেশ স্পর্শকাতর ও বৈচিত্র্যময়। দীর্ঘ সময় ধরে খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে দায়িত্ব পালন করার কারণে রাশেদুল হক সেখানকার বাস্তব সমস্যা, প্রত্যাশা এবং উন্নয়নমূলক চ্যালেঞ্জগুলো সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত।
মন্ত্রীর একান্ত সচিব পদে তার এই নিবিড় অভিজ্ঞতা পার্বত্য অঞ্চলের টেকসই উন্নয়ন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর কল্যাণ এবং সরকারের নীতি ও পরিকল্পনার দ্রুত বাস্তবায়নে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখবে। শিক্ষা, টাস্কফোর্স এবং কেন্দ্রীয় প্রশাসনের এই বহুমুখী অভিজ্ঞতার মেলবন্ধন আগামীর দিনগুলোতে তাকে শুধু মন্ত্রণালয়ের কাজের গতি বাড়াতেই সাহায্য করবে না, বরং দেশের জনপ্রশাসনে পাহাড়কেন্দ্রিক নীতি-নির্ধারণে একজন দক্ষ ও সফল কর্মকর্তা হিসেবে তাকে আরও উঁচুতে প্রতিষ্ঠিত করবে।
লেখক: পার্বত্য চট্টগ্রাম।

