পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি এবং এর পরবর্তী নিরাপত্তাজনিত বাস্তবতার জটিল রূপটি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয়। ১৯৯৭ সালে স্বাক্ষরিত ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তির অন্যতম মূল শর্ত ছিল পার্বত্য অঞ্চল থেকে স্থায়ী সেনানিবাস ব্যতিরেকে অস্থায়ী সেনাক্যাম্পসমূহ পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার করা। চুক্তি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সরকার বিভিন্ন সময়ে মোট ২৪১টি সেনাক্যাম্প প্রত্যাহার করে নেয়। মূলত পাহাড়ি অঞ্চলের বেসামরিক শাসন জোরদার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা অর্জনের লক্ষ্যেই এই ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। তবে প্রত্যাহারের পর পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শনের কথা থাকলেও তা বাস্তব রূপ লাভ করেনি, যা পরবর্তীতে নিরাপত্তার বড় সংকট তৈরি করে।
পার্বত্য চুক্তির শর্তানুযায়ী জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) এবং এর সভাপতি সন্তু লারমার ক্যাডারদের কাছে থাকা সমস্ত অবৈধ অস্ত্র সরকারের কাছে সমর্পণ করার কথা ছিল। তবে বাস্তবে জেএসএস তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন সশস্ত্র শাখার সম্পূর্ণ অস্ত্র সমর্পণ করেনি। অবৈধ অস্ত্র জমা না দিয়ে সেগুলোকে নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাব ধরে রাখা এবং আঞ্চলিক ক্ষমতা প্রদর্শনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে থাকে। চুক্তি স্বাক্ষরকারী প্রধান দল নিজেই সশস্ত্র রূপ বজায় রাখার ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী শান্তির সূচনাতেই বড় ধরনের অন্তরায় সৃষ্টি হয়। ফলে বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার যে শুভ উদ্দেশ্য ক্যাম্প প্রত্যাহারের পেছনে ছিল, তা শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়ে।
চুক্তির পরবর্তী সময়ে চুক্তির পক্ষ ও বিপক্ষ নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের আঞ্চলিক রাজনীতি দ্রুত বিভাজিত হয়ে পড়ে। চুক্তির বিরোধিতা করে গঠিত হয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। পরবর্তীতে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জেএসএস এবং ইউপিডিএফ উভয় সংস্থাই মূল ও সংস্কারবাদী উপদলে বিভক্ত হয়ে মোট চার থেকে পাঁচটি প্রধান সশস্ত্র গোষ্ঠীতে পরিণত হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সশস্ত্র দলগুলোর রাজনৈতিক আদর্শের চেয়ে প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে সামরিক শক্তি বাড়ানো এবং নির্দিষ্ট এলাকাভিত্তিক প্রভাব তৈরি করা। চুক্তি বাস্তবায়নের দীর্ঘ প্রক্রিয়ার সুযোগ নিয়ে এই দলগুলো সুসংগঠিত হয়ে ওঠে এবং পাহাড়ি এলাকাগুলোতে নিজেদের একছত্র আধিপত্য বিস্তার শুরু করে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের এই সশস্ত্র গ্রুপগুলো তাদের পরিচালনা ব্যয় এবং ক্যাডারদের অর্থায়নের জন্য বিস্তৃত এক চাঁদাবাজির সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে। পরিবহন, গাছ ব্যবসা, জুম চাষ, সরকারি উন্নয়নমূলক কাজ এমনকি সাধারণ দোকানদারদের কাছ থেকেও নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হয়। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে অপহরণ, নির্যাতন এবং হত্যার মতো ঘটনা ঘটে। এর ফলে পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনীতি মারাত্মকভাবে থমকে গেছে। সাধারণ পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই এই নিরবচ্ছিন্ন চাঁদাবাজির শিকার হয়ে চরম আতঙ্কের মধ্যে দিনপাত করছে। পাহাড়ি অঞ্চলের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা এবং পর্যটন খাত এই অরাজক অবস্থার কারণে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতির কারণে এই গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে প্রায়শই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, আধিপত্য বিস্তারের লড়াই এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড ঘটে চলেছে। শুধু প্রতিপক্ষ সংগঠনের সদস্য নয়, বরং নিজেদের অনুগত না থাকলে বা চাঁদা না দিলে সাধারণ নিরীহ মানুষকেও গুম এবং নির্মমভাবে হত্যা করা হচ্ছে। আঞ্চলিক সশস্ত্র দলগুলোর মধ্যকার এই “গ্যাং ওয়ার” বা ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত পাহাড়ি জনপদকে একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করেছে। আইনের শাসনের অভাব এবং ভৌগোলিক দুর্গমতার সুযোগ নিয়ে ক্যাডাররা অপরাধ সংঘটনের পর গহীন জঙ্গলে গা ঢাকা দেয়, ফলে তাদের চিহ্নিত করে সাজা দেওয়া সিভিল প্রশাসনের পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তঘেঁষা দুর্গম পাহাড়ি এলাকা বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক হুমকিতে রূপ নিয়েছে। এই সীমান্ত অঞ্চলগুলো দিয়ে অস্ত্র চোরাচালান, মাদক ব্যবসা এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে ওঠার খবর পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক সীমানা অরক্ষিত থাকায় এবং অভ্যন্তরীণ সামরিক তদারকি কম থাকায় এই অঞ্চল বিচ্ছিন্নতাবাদী ও উগ্রপন্থী দলগুলোর সুরক্ষিত ঘাঁটিতে পরিণত হচ্ছে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ভেতর এমন কোনো অঞ্চল থাকা বিপজ্জনক, যেখানে রাষ্ট্রের একক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা ব্যাহত হয় এবং যেখানে সশস্ত্র গ্রুপগুলো সমান্তরাল বা প্যারালাল প্রশাসন পরিচালনা করে।
২৪১টি সেনাক্যাম্প প্রত্যাহারের ফলে যে ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছিল, অপরাধী চক্রগুলো সুচতুরভাবে তার সুযোগ নিয়েছে। সেনাবাহিনীর অনুপস্থিতিতে গহীন পাহাড়ি অঞ্চলে বেসামরিক পুলিশ বা আনসার বাহিনীর পক্ষে সশস্ত্র ও আধুনিক মারণাগ্রে সজ্জিত ক্যাডারদের মোকাবিলা করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি কমে যাওয়ায় সন্ত্রাসীরা সহজেই অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে পেরেছে। সেনা ক্যাম্প প্রত্যাহারের সিদ্ধান্তটি যে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি আনার পরিবর্তে নিরাপত্তাহীনতাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, তা বিগত বছরগুলোর অপরাধ ও সংঘাতের পরিসংখ্যান থেকেই সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়।
পার্বত্য অঞ্চলের সার্বভৌমত্ব ও স্থায়িত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য প্রত্যাহারকৃত ২৪১টি সেনাক্যাম্প পুনর্স্থাপন করা সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের কঠোরভাবে দমন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীই একমাত্র কার্যকর ও আস্থাভাজন শক্তি। সেনা ক্যাম্পগুলো পুনরায় চালু হলে দুর্গম এলাকাগুলোতে নিয়মিত টহল ও নজরদারি বাড়ানো সম্ভব হবে, যা অবৈধ অস্ত্রের সরবরাহ এবং অপরাধীদের অবাধ চলাচল স্তব্ধ করে দেবে। সেনাবাহিনীর স্থায়ী ও জোরালো উপস্থিতি স্থানীয় পাহাড়ি ও বাঙালি জনগোষ্ঠীর মাঝে নিরাপত্তার নতুন আশ্বাস তৈরি করবে এবং বেসামরিক প্রশাসনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে সাহায্য করবে।
পার্বত্য অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার স্বার্থে সেনাক্যাম্প পুনর্স্থাপনের পাশাপাশি সশস্ত্র সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে অবিলম্বে একটি অল-আউট বা সর্বাত্মক চিরুনি অভিযান পরিচালনা করা আবশ্যক। আধুনিক গোয়েন্দা নজরদারি এবং বিশেষ সামরিক অপারেশনের মাধ্যমে পাহাড়ের আস্তানাগুলো গুড়িয়ে দিতে হবে এবং অবৈধ অস্ত্র চিরতরে বাজেয়াপ্ত করতে হবে। রাজনীতি বা অধিকারের নামে সশস্ত্র অবস্থান এবং চাঁদাবাজি বন্ধে রাষ্ট্রকে “জিরো টলারেন্স” নীতি গ্রহণ করতে হবে। আইন অমান্যকারী অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে বিচারের মুখোমুখি না করা পর্যন্ত এই অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। তাই সার্বভৌম সুরক্ষার খাতিরে সেনা তৎপরতা জোরদার করা ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই।
সবমিলিয়ে বলা যায়, পার্বত্য চুক্তির প্রতি শ্রদ্ধা রেখেও দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও অখণ্ডতাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া জরুরি। চুক্তি ছিল শান্তির জন্য, তবে সেই সুযোগে যদি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও সাধারণ মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়ে, তবে কৌশলগত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করাই বিচক্ষণতা। পাহাড়ি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীর সহাবস্থান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং চিরস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করার পূর্বশর্তই হলো সন্ত্রাসমুক্ত পরিবেশ। প্রত্যাহারকৃত সেনা ক্যাম্প পুনর্স্থাপন এবং যৌথ বাহিনীর কঠোর অভিযানের মাধ্যমে পাহাড়কে অস্ত্র মুক্ত করা সম্ভব হলে পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্ত সুরক্ষিত থাকবে এবং সেখানে জাতীয় সার্বভৌমত্ব আরও সুসংহত হবে।
লেখক: এম মহাসিন মিয়া
লেখক ও পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক গবেষক।
ইমেইল: mmohasinmiah013@gmail.com

