পাহাড়ের বুকে বসন্তের হাওয়া মানেই অন্যরকম এক আবেশ। কুয়াশা ঝরা শীত পেরিয়ে নতুন পাতার সবুজে, ফুলের রঙে আর তারুণ্যের উচ্ছ্বাসে যখন চারপাশ ভরে ওঠে,তখন বসন্ত কেবল একটি ঋতু নয়, হয়ে ওঠে অনুভূতির নাম। সেই অনুভূতিকেই বুকে ধারণ করে খাগড়াছড়ি সরকারি মহিলা কলেজে অনুষ্ঠিত হলো বর্ণাঢ্য বসন্ত বরণ ও পিঠা উৎসব।
দিনব্যাপী এই আয়োজন যেন রঙ, গান, ঐতিহ্য আর মিলনের এক অনন্য উৎসবে পরিণত হয়। কলেজের অধ্যক্ষ পুলক বরন চাকমা’র সভাপতিত্বে আয়োজিত এ উৎসব উদ্বোধন করেন খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত। এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জেলা পরিষদের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা নোমান হোসেন, জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক সাজিয়া তাহের, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রুমানা আক্তার, জেলা ক্রীড়া কর্মকর্তা হারুন-অর রশিদসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, কলেজের শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শত শত প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থী।
রঙের ক্যানভাসে রূপ নিলো ক্যাম্পাস:
সকাল থেকেই কলেজ প্রাঙ্গণে ছিল উৎসবের আমেজ। কারও গায়ে বাসন্তী শাড়ি, কারও লাল-হলুদের মিশেলে নকশিকাঁথা ডিজাইনের শাড়ি, কারও হাতে ফুলের তোড়াখোঁপায় গাঁদা কিংবা রজনীগন্ধা। রঙিন ওড়নায় সেজে ওঠা শিক্ষার্থীদের হাসিমুখে যেন ফুটে উঠেছিল বসন্তেরই প্রতিচ্ছবি। পুরো ক্যাম্পাস যেন হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত রঙের ক্যানভাস। বন্ধুদের সঙ্গে সেলফি, দলবেঁধে ছবি তোলা, হাসি-ঠাট্টা আর গল্পে মুখর ছিল চারপাশ। প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে যেন তৈরি হয় এক আন্তরিক পুনর্মিলনী। পুরোনো স্মৃতি আর নতুন স্বপ্নের মেলবন্ধনে দিনটি হয়ে ওঠে বিশেষ।
মঞ্চে গান, নাচ আর সংস্কৃতির ছোঁয়া:
উৎসবের মূল আকর্ষণ ছিল বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক আয়োজন। মঞ্চজুড়ে পরিবেশিত হয় দলীয় সংগীত“এসো হে বসন্ত…”। গানটির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নৃত্য পরিবেশনায় মাতিয়ে তোলেন শিক্ষার্থীরা। বাংলার সংস্কৃতির ঐতিহ্যবাহী গানের পাশাপাশি ছিল পাহাড়ি সংস্কৃতির মনোমুগ্ধকর পরিবেশনা। চাকমা, ত্রিপুরা ও মারমা সংস্কৃতির ছোঁয়ায় আয়োজনে যুক্ত হয় ভিন্নমাত্রা।
শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অংশগ্রহণ আয়োজনকে করে তোলে আরও প্রাণবন্ত। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে শিক্ষকদের এমন আন্তরিক সম্পৃক্ততা ক্যাম্পাসে সৃষ্টি করে পারিবারিক আবহ।
পিঠার পসরা: ঐতিহ্যের স্বাদ:
বসন্ত বরণ মানেই পিঠাপুলির আয়োজন। উৎসব প্রাঙ্গণে শিক্ষার্থীদের নিজস্ব স্টলে সাজানো ছিল নকশি পিঠা, অনথন, পুলি পিঠা, গাঁদা পিঠা, ডিম পিঠা, জামাই পিঠা, পকি, পাটিসাপটা সহ হরেক রকমের ঐতিহ্যবাহী পিঠা। রঙিন সাজে সাজানো এসব স্টল শুধু স্বাদের নয়, ছিল নান্দনিক উপস্থাপনারও প্রতিযোগিতা।
এক শিক্ষার্থী হাসতে হাসতে বলছিলেন, “আমরা কয়েকদিন ধরেই প্রস্তুতি নিয়েছি। নিজের হাতে পিঠা বানিয়ে বিক্রি করছি,এটা আমাদের জন্য গর্বের।”
শিক্ষার্থীদের চোখে বসন্ত:
খাগড়াছড়ি সরকারি মহিলা কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী শ্রাবন্তী গুপ্ত বলেন,“বসন্ত আমাদের কাছে নতুন শুরুর প্রতীক। পড়ালেখার ব্যস্ততার মাঝেও আমরা এই দিনটার জন্য অপেক্ষা করি। আজকে সত্যিই খুব ভালো লাগছে। কলেজে ফিরে এসে আবার সেই পুরোনো দিনগুলো মনে পড়ছে।”
দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শিক্ষার্থী পৌরনীতি চাকমা বলেন,“আমাদের কলেজে প্রতি বছর এমন মনোমুগ্ধকর বসন্ত বরণ ও পিঠা উৎসব হয়। অনেক পুরোনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। আজকের এই মিলনমেলা সত্যিই অসাধারণ।”
শিক্ষার্থী শ্রাবণী ত্রিপুরা বলেন,
“বসন্ত মানেই রঙ আর আনন্দ। আজকে আমরা সবাই একসঙ্গে যে আনন্দ ভাগাভাগি করছি, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এই উৎসব আমাদের ভেতরে নতুন শক্তি জাগায়।”
এইচএসসি পরীক্ষার্থী খুশি চাকমা বলেন,“আমি নতুন ভর্তি হয়েছি। এত বড় আয়োজন আগে দেখিনি। সিনিয়র আপুদের সঙ্গে অংশ নিতে পেরে খুব ভালো লাগছে। মনে হচ্ছে কলেজটা শুধু পড়ালেখার জায়গা নয়, একটা পরিবার।”
আরেক শিক্ষার্থী জান্নাতুল। মাওয়া বলেন, “পিঠা উৎসবটা আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছে। আমরা নিজেরা বানিয়েছি, সাজিয়েছি। সবাই প্রশংসা করছে,এটাই সবচেয়ে বড় পাওয়া।”
অতিথিদের অভিব্যক্তি: জেলা প্রশাসক মো. আনোয়ার সাদাত বলেন,“বসন্ত উৎসব আর কলেজ ক্যাম্পাস,দুটোর মেলবন্ধন সত্যিই চমৎকার। এমন সৃজনশীল আয়োজন আমাদের মুগ্ধ করেছে। শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত অংশগ্রহণ দেখলে ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হওয়া যায়।”
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শেফালিকা ত্রিপুরা বলেন,“বসন্ত বরণ ও পিঠা উৎসব আমাকে খুবই মুগ্ধ করেছে। শিক্ষার্থীদের আয়োজন, শৃঙ্খলা ও সৃজনশীলতা সত্যিই প্রশংসনীয়। এ ধরনের অনুষ্ঠান আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করে।”
কলেজের অধ্যক্ষ পুলক বরন চাকমা বলেন,“এ ধরনের আয়োজন শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বসন্ত আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই উৎসব শিক্ষার্থীদের মাঝে ইতিবাচক শক্তি ও সৃজনশীলতা জাগিয়ে তোলে।”
মিলনমেলা ও নতুন স্বপ্নের বার্তা:
বসন্ত মানেই নতুন কুঁড়ির জন্ম, নতুন স্বপ্নের সূচনা। খাগড়াছড়ির পাহাড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মিলেমিশে কলেজ ক্যাম্পাস যেন হয়ে ওঠে এক টুকরো বসন্তের স্বর্গ। সবুজ পাহাড়, নির্মল বাতাস আর রঙিন পোশাকে সজ্জিত শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিতে পুরো পরিবেশ ছিল উচ্ছ্বাসময়।
এই উৎসব কেবল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান নয়; এটি ছিল প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা। পুরোনো বন্ধুত্বের পুনরুজ্জীবন, নতুন সম্পর্কের সূচনা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুননের এক অনন্য সুযোগ।
তারুণ্য মানেই প্রাণ, তারুণ্য মানেই সৃষ্টির শক্তি—এই সত্যকেই যেন নতুন করে প্রমাণ করলো খাগড়াছড়ি সরকারি মহিলা কলেজ। রঙে রঙে, হাসিতে-আনন্দে মুখর এই বসন্ত বরণ ও পিঠা উৎসব ছড়িয়ে দিলো ভালোবাসা, বন্ধুত্ব আর সংস্কৃতির বার্তা।
পাহাড়ে বসন্তের এই রঙিন উৎসব যেন ছড়িয়ে দেয় নতুন আশার আলো,মননে, সংস্কৃতিতে এবং জীবনের প্রতিটি অধ্যায়ে। স্মৃতির অ্যালবামে রঙিন হয়ে থাকবে এই দিনটি; আর আগামী বছর আবারও বসন্তের অপেক্ষায় থাকবে প্রিয় ক্যাম্পাস, প্রিয় মুখগুলো।

