বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল হলো পার্বত্য চট্টগ্রাম। খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান নিয়ে গঠিত এই পার্বত্য অঞ্চল কেবল প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই নয়, বরং ভূ-রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেও দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় রয়েছে।
এখানে বসবাসরত উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনগোষ্ঠী আজ থেকে কয়েকশো বছর পূর্বে এ অঞ্চলে আসে। তারা কেউ ভারত থেকে, কেউ মিজোরাম, কেউ মায়ানমার, কেউ ত্রিপুরা, কেউবা তিব্বত ও মঙ্গোলিয়া থেকে অভিবাসী হয়ে এসে পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থায়ী আশ্রয় নেয়। ইতিহাসবিদগণও একমত যে, রোহিঙ্গাদের মতোই এই জনগোষ্ঠী মূলত বাইরের অঞ্চল থেকে অভিবাসী হয়ে এসে এখানে বসতি স্থাপন করে।
ফলে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, পোশাক, আচার-আচরণ ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সাথে বাংলাদেশের মূলধারার সংস্কৃতির তুলনায় ভারত, মিজোরাম, ত্রিপুরা কিংবা মায়ানমারের সাদৃশ্য বেশি। এই সাংস্কৃতিক সাদৃশ্যকে ভিত্তি করে একাংশ প্রায়শই বাংলাদেশের প্রতি অনীহা প্রকাশ করে থাকে। তারা মনে করে পার্বত্য চট্টগ্রাম তাদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্যের সাথে ভারতীয় ভূখণ্ডেরই অংশ, বাংলাদেশ নয়। এ কারণেই দীর্ঘদিন ধরে কিছু গোষ্ঠী বিদেশি মদদে ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে বৃহত্তর ভারতের অন্তর্ভুক্ত করার কূটচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় সত্য হলো যে, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতিরা যতো পূর্বে যেখান থেকেই আসুক না কেন, তাদেরকে ছোট করে দেখা বা ভাবার সুযোগ নেই। কারণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী রাষ্ট্র এবং সংবিধান তাঁদেরকে বাংলাদেশের উপজাতি বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হিসেবে দেশের প্রকৃত এবং বৈধ নাগরিক বলে স্বীকৃতি দিয়েছে। সেক্ষেত্রে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল উপজাতি বাংলাদেশের প্রকৃত নাগরিক। তারা কস্মিনকালেও পার্বত্য চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের আদিবাসী ছিলেন না।
-বিদেশি প্রভাব ও অভ্যন্তরীণ ষরযন্ত্র:. এই ষড়যন্ত্রকে বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক এনজিও, বিদেশি মানবাধিকার সংস্থা এবং কিছু রাষ্ট্র নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করছে। তাদের সরবরাহকৃত অর্থ, প্রশিক্ষণ ও প্রচারণার মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা চলছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রবিরোধী মনোভাব তৈরি করে বাংলাদেশকে অবিশ্বাস করার পরিবেশ সৃষ্টি করা হচ্ছে। মাঝে মাঝে বিদেশি গণমাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে “সংখ্যালঘু নিপীড়িত অঞ্চল” আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করার চেষ্টা তারই অংশ।
-বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ: কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই যে, পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশ, সব সরকারের কাছেই এই অঞ্চল ছিল রাষ্ট্রের অপরিহার্য অংশ। এবং সবচেয়ে বড় সত্য হলো যে, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও নোয়াখালীর অংশবিশেষ মুক্তিযুদ্ধের ১ নম্বর সেক্টরের অধীনে ছিলো। এই সেক্টরের প্রথম কমান্ডার ছিলেন, মেজর জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে জুন মাস থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মেজর রফিকুল ইসলাম এই সেক্টরের দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে এবং সংবিধানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, দেশের ভৌগোলিক সীমারেখা অখণ্ড ও অবিভাজ্য। তাই কেউ যদি ইতিহাস বিকৃত করে এ অঞ্চলকে বিদেশি ভূখণ্ডের সাথে মেলাতে চায়, তা কেবল ষড়যন্ত্রই নয় বরং রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল।
-শান্তি, উন্নয়ন ও সমঅধিকার: বাংলাদেশ সরকার সবসময়ই চেয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীকে মূলধারার উন্নয়ন ও সমঅধিকারের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করতে। সড়ক যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ, পর্যটন উন্নয়নসহ নানা প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইতোমধ্যেই এই অঞ্চলের আর্থসামাজিক চিত্র পাল্টে গেছে। সেনাবাহিনী, বিজিবি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী শুধু নিরাপত্তার দায়িত্বই পালন করছে না বরং তারা উপজাতি ও বাঙালি উভয় জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়িয়ে উন্নয়ন সহযোগী হিসেবেও কাজ করছে।
অতএব, পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত উপজাতিদের উচিত ইতিহাস বিকৃত না করে বাস্তবতাকে মেনে নেওয়া। এ ভূমি বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটাই চূড়ান্ত সত্য। বিদেশি প্রভাব ও বিভ্রান্তি পরিহার করে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা রাখা এবং বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী একসাথে হাতে হাত রেখে এগিয়ে গেলে এই অঞ্চল শান্তি, সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে।
_এম মহাসিন মিয়া, সাংবাদিক ও লেখক, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা।

