রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান- এই তিন পার্বত্য জেলা নিয়ে গঠিত পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের মানচিত্রে যেমন আলাদা বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, তেমনি সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায়ও এটি এক জটিল ও গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পাহাড়, নদী, বন এবং নানা জাতিগোষ্ঠীর সহাবস্থান- সব মিলিয়ে এটি যেন এক জীবন্ত বৈচিত্র্যের প্রতিচ্ছবি। কিন্তু একই সঙ্গে এটি বারবার উত্তেজনা, সংঘাত ও অবিশ্বাসের আবর্তে পড়ে যায়। তাই প্রশ্ন জাগে- পাহাড় কেন বারবার বিদ্বেষের আগুনে জ্বলে?
এই প্রশ্নের উত্তর একক কোনো কারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং এটি একটি বহুমাত্রিক বাস্তবতা, যেখানে ইতিহাস, রাজনীতি, অর্থনীতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং মনস্তত্ত্ব একসঙ্গে কাজ করে। এই আলোচনায় সেই জটিল বাস্তবতাকে অনুধাবন করার চেষ্টা করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট- আস্থাহীনতার শেকড়: পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যা বোঝার জন্য ইতিহাস জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ শাসনামলে এই অঞ্চলকে আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে রাখা হয়, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারা ছিল তুলনামূলকভাবে স্বতন্ত্র। সেই সময় থেকেই এই অঞ্চল একটি ভিন্নধর্মী শাসন কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়ে আসছে। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের প্রক্রিয়ায় এই অঞ্চলের প্রশাসনিক কাঠামোয় পরিবর্তন আসে। তবে এই পরিবর্তন অনেকের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ সৃষ্টি করে। ১৯৭০ ও ১৯৮০ এর দশকে সংঘাতপূর্ণ পরিস্থিতি এই আস্থাহীনতাকে আরও গভীর করে তোলে। পরে ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি) একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মতপার্থক্য ও বিতর্ক চলমান। এই দীর্ঘ ইতিহাসের ফলস্বরূপ, অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্র ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই আস্থাহীনতাই অনেক সময় বিভিন্ন উত্তেজনার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
ভূমি সমস্যা- সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু: পার্বত্য চট্টগ্রামে ভূমি একটি অত্যন্ত নাজুক ও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এখানে জমি কেবল অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, যেন এটি মানুষের পরিচয়, সংস্কৃতি এবং জীবনধারার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অভিবাসন এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে এখানে জমি নিয়ে প্রতিযোগিতা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে জমির মালিকানা নিয়ে একাধিক পক্ষের দাবি দেখা যায়। আবার কিছু ক্ষেত্রে ভূমি দখল, পুনর্বাসন বা ব্যবহার সংক্রান্ত বিরোধও সৃষ্টি হয়। এই ভূমি সংক্রান্ত বিরোধগুলো অনেক সময় জাতিগত বা রাজনৈতিক রূপ নেয়। ফলে একটি সাধারণ জমি সংক্রান্ত সমস্যা ধীরে ধীরে বড় ধরনের সামাজিক উত্তেজনা বা সংঘাতে পরিণত হতে পারে।
রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব- অংশগ্রহণের সংকট: পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনৈতিক কাঠামো একটি জটিল বিষয়। এখানে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিনিধিত্বের দাবি রয়েছে। তবে অনেকের মতে, এই প্রতিনিধিত্ব সবসময় যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না। আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনগুলো তাদের দাবির পক্ষে অবস্থান নিলেও জাতীয় রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে তাদের সম্পর্ক অনেক সময় দ্বন্দ্বপূর্ণ থাকে। ফলে সাধারণ মানুষের একটি অংশ মনে করে, তাদের প্রকৃত চাহিদা ও সমস্যা যথাযথভাবে উপস্থাপিত হচ্ছে না। এই প্রতিনিধিত্বের ঘাটতি মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে, যা পরবর্তীতে সংঘাত বা উত্তেজনায় রূপ নিতে পারে।
নিরাপত্তা বাহিনী- নিয়ন্ত্রণ ও সূক্ষ্মতার দ্বৈততা: পার্বত্য চট্টগ্রামে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি একটি বাস্তব ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে এটি স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার জন্য অপরিহার্য। অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তা বাহিনী সংঘাত ও সহিংসতা প্রতিরোধ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি স্থানীয় জনগণের সার্বিক জীবনে ইতিবাচক হলেও একটি অংশ বা স্বার্থান্বেষী মহলের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি নিয়ে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। ফলে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার অংশ হিসেবে স্থানীয় জনগণের সার্বিক নিরাপত্তা ও জানমাল রক্ষার্থে স্বার্থান্বেষী মহল বা বিচ্ছিন্নতাবাদীদের বিরুদ্ধে নিরাপত্তা বাহিনীর বিশেষ অভিযান ও কঠোরতার ফলে কখনো কখনো নিরাপত্তা বাহিনী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান তৈরি হয়। ফলে কখনো কখনো এমন ঘটনার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি বা অবিশ্বাস তৈরি হয়। এই দ্বৈত বাস্তবতা একদিকে নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে সংবেদনপ্রবণ- পাহাড়ের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
পরিচয়ের রাজনীতি- বৈচিত্র্যের ভেতর বিভাজন: পার্বত্য চট্টগ্রাম বহুজাতিক ও বহুভাষিক মানুষের বসবাসরত একটি অঞ্চল। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, ম্রোসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর পাশাপাশি বাঙালি জনগোষ্ঠীরও এখানে বসবাস রয়েছে। এই বৈচিত্র্য একদিকে সমৃদ্ধির প্রতীক, অন্যদিকে কখনো কখনো বিভাজনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জাতিগত পরিচয়ের প্রশ্ন স্বার্থান্বেষী মহল কতৃক অনেক সময় রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হয়। সাংস্কৃতিক স্বীকৃতি, ভাষাগত অধিকার এবং পরিচয়ের প্রশ্ন- এসব বিষয় যখন সহনশীলতার সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন তা বিভাজন ও বিদ্বেষের জন্ম দেয়। পরিচয়ের রাজনীতি যদি পারস্পরিক সম্মান ও সহাবস্থানের ভিত্তিতে পরিচালিত না হয়, তবে তা সংঘাতের দিকে ধাবিত হতে পারে।
অর্থনৈতিক বৈষম্য- উন্নয়নের অসম বণ্টন: পার্বত্য চট্টগ্রামে উন্নয়ন কার্যক্রম চলমান থাকলেও এখনো অনেক ক্ষেত্রে উন্নয়ন অসমভাবে বণ্টিত। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এখনো বৈষম্য লক্ষ্য করা যায়। যখন একটি জনগোষ্ঠী নিজেদের উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত মনে করে, তখন তাদের মধ্যে ক্ষোভ জন্ম নেয়। এই ক্ষোভ অনেক সময় ভুল পথে পরিচালিত হয়ে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। উন্নয়নের এই অসমতা কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং সামাজিক ও মানসিক বৈষম্যের অনুভূতিও তৈরি করে, যা বিদ্বেষকে আরও উসকে দেয়।
গুজব ও অপপ্রচার- উত্তেজনার দ্রুত বিস্তার: বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এই দ্রুততার সঙ্গে সঙ্গে গুজব ও অপপ্রচারের বিস্তারও বেড়েছে। অনেক সময় একটি ছোট ঘটনা বিকৃতভাবে উপস্থাপিত হয়ে বড় ধরনের উত্তেজনা তৈরি করে। পার্বত্য চট্টগ্রামে অতীতেও এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে ভুল তথ্য বা অপপ্রচার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার অনেক সময় মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং পারস্পরিক অবিশ্বাস বাড়ায়। সঠিক তথ্য ও সচেতনতার অভাব এই সমস্যাকে আরও তীব্র করে তোলে।
আঞ্চলিক ও কৌশলগত প্রভাব: পার্বত্য চট্টগ্রাম সীমান্তবর্তী একটি অঞ্চল হওয়ায় এর ভৌগোলিক ও কৌশলগত গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এই অবস্থান আঞ্চলিক ভূরাজনীতির প্রভাবকে এখানে প্রবেশ করতে সহায়তা করে। কখনো কখনো আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থ এই অঞ্চলের পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে। ফলে স্থানীয় সমস্যাও বৃহত্তর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে রূপ নেয়। এই জটিল বাস্তবতা পাহাড়ের পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সমাধানের দিক- শান্তি, সহনশীলতা ও অন্তর্ভুক্তি: পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যার সমাধান কোনো একক পদক্ষেপে সম্ভব নয়। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যেখানে সকল পক্ষের অংশগ্রহণ প্রয়োজন। প্রথমত- আস্থা পুনর্গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং স্থানীয় জনগণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর অস্ত্রের রাজনীতি ও আধিপত্যের লড়াই বন্ধ করে রাষ্ট্র, প্রশাসন ও জনগণের স্বার্থে সংলাপে বসতে হবে। দ্বিতীয়ত- পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত সকল জাতিগোষ্ঠীর মানুষের অভিন্ন পরিচয় সবাই বাংলাদেশী। ভূমি সমস্যা নিরসনে একটি স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া প্রয়োজন। ভূমি ব্যবস্থাপনায় নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত- রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে হবে। স্থানীয় সকল জাতিগোষ্ঠীর জনগণের মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। চতুর্থত- শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তরুণ প্রজন্মকে সহনশীলতা, সম্মান ও সহাবস্থানের শিক্ষা দিতে হবে। পঞ্চমত- নিরাপত্তা বাহিনী ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক উন্নয়ন করতে হবে। পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি পেলে অনেক সমস্যার সমাধান সহজ হবে।
শান্তির পথে এগিয়ে যাওয়া: পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ ও অমূল্য সম্পদ। এর সৌন্দর্য, বৈচিত্র্য ও সম্ভাবনা দেশকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু এই অঞ্চল বারবার বিদ্বেষের আগুনে জ্বলে ওঠার পেছনে রয়েছে বহুস্তরীয় কারণ। এই আগুন নিভাতে হলে প্রয়োজন শুধু আইন বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, প্রয়োজন সকল জাতিগোষ্ঠীর মানুষের মনোজগতের পরিবর্তন। প্রয়োজন সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক চিন্তা। পাহাড় তখনই শান্ত হবে, যখন মানুষের হৃদয়ে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। বিদ্বেষের বদলে যদি সহাবস্থানের বীজ বপন করা যায়, তবে এই অঞ্চল সত্যিই হয়ে উঠতে পারে শান্তি, সমৃদ্ধি ও সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এখনই সময়- বিদ্বেষ নয়, বরং জাতিগোষ্ঠী নির্বিশেষে শান্তি ও সমঝোতার পথে এগিয়ে যাওয়ার।
লেখক: এম মহাসিন মিয়া
সাংবাদিক, লেখক ও আঞ্চলিক গবেষক- পার্বত্য চট্টগ্রাম।
ইমেইল: mmohasin942297@gmail.com

