খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলাকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রসবজনিত ফিস্টুলামুক্ত উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। “ফিস্টুলা আক্রান্ত নারীর স্বাস্থ্য ও অধিকার নিশ্চিত করি, প্রসবজনিত ফিস্টুলামুক্ত দেশ গড়ি”—এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে প্রতি বছরের খাগড়াছড়ি জেলা সিভিল সার্জন অফিসের কনফারেন্স রুমে আয়োজিত ফিস্টুলা বিষয়ক এক সভায় এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
সভাটির আয়োজন করে খাগড়াছড়ি জেলা সিভিল সার্জন অফিস, সহযোগিতায় ছিল বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা Centre for Injury Prevention and Research, Bangladesh (CIPRB)। এছাড়াও কর্মসূচিতে অর্থায়ন সহায়তা প্রদান করে GAC এবং কারিগরি সহযোগিতায় ছিল জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA)।
প্রসবজনিত ফিস্টুলা একটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও কষ্টদায়ক নারী স্বাস্থ্য সমস্যা। বাংলাদেশে এ রোগের প্রকোপ উল্লেখযোগ্যভাবে কমলেও এখনো দেশ পুরোপুরি ফিস্টুলামুক্ত নয়। বাংলাদেশ সরকার ২০৩০ সালের মধ্যে দেশ থেকে প্রসবজনিত ফিস্টুলা নির্মূল এবং সকল ফিস্টুলা রোগীকে স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনার অঙ্গীকার করেছে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই মহালছড়ি উপজেলার এই অর্জনকে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, জাতিসংঘ ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিকভাবে প্রসবকালীন ফিস্টুলা নির্মূল দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রতি বছর ২৩ মে বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক প্রসবকালীন ফিস্টুলা নির্মূল দিবস পালিত হয়ে আসছে।
খাগড়াছড়ি জেলার সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাবেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত দিনব্যাপী সভায় শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. রতন খীসা। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের ডিডিএফপি ফারুক আবদুল্লাহ।
ফিস্টুলা রোগের কারণ, প্রতিকার ও প্রতিরোধ বিষয়ে বিস্তারিত আলোকপাত করেন ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট আধুনিক জেলা সদর হাসপাতালের সিনিয়র গাইনি কনসালটেন্ট ডা. জয়া চাকমা। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন মহালছড়ি উপজেলা হাসপাতালের ইউএইচএফপিও (UHFPO) ও ইউএফপিও (UFPO) মহোদয়গণ।
সভায় বক্তারা বলেন, মাঠপর্যায়ের চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের সম্মিলিত ও নিরলস প্রচেষ্টার ফলেই মহালছড়ি উপজেলাকে ফিস্টুলামুক্ত ঘোষণা করা সম্ভব হয়েছে।
আলোচনা শেষে মহালছড়ি উপজেলার ইউএইচএফপিও ও ইউএফপিও মহোদয়ের হাতে তাঁদের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। পাশাপাশি তিনজন ফিস্টুলা রোগীর হাতে পুনর্বাসন সহায়তা হিসেবে সেলাই মেশিন এবং ছাগল কেনার জন্য নগদ অর্থ প্রদান করা হয়।
সভা শেষে সমাপনী বক্তব্যে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মুহাম্মদ সাবের বলেন,“মহালছড়ি উপজেলাকে প্রসবজনিত ফিস্টুলামুক্ত উপজেলা হিসেবে ঘোষণা করতে পেরে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। এটি আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগের সম্মিলিত ও নিরলস প্রচেষ্টার ফল। প্রসবজনিত ফিস্টুলা নারীর শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক জীবনে মারাত্মক প্রভাব ফেলে। সরকার যে ২০৩০ সালের মধ্যে দেশকে সম্পূর্ণ ফিস্টুলামুক্ত করার অঙ্গীকার করেছে, মহালছড়ির এই অর্জন সেই লক্ষ্যের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।”
তিনি আরও বলেন, “এই সাফল্যের পেছনে মাঠপর্যায়ের চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট সকলের আন্তরিক অবদান রয়েছে। বিশেষ করে মহালছড়ি উপজেলা হাসপাতালের ইউএইচএফপিও ও ইউএফপিও মহোদয়দের ভূমিকা প্রশংসনীয়। আমি UNFPA, GAC এবং CIPRB-কে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই তাদের সহযোগিতার জন্য।”
তিনি পুনর্বাসন সহায়তা পাওয়া ফিস্টুলা রোগীদের সুস্থ ও স্বাবলম্বী জীবনের জন্য শুভকামনা জানান এবং অন্যান্য উপজেলাতেও একইভাবে সচেতনতা ও সেবার বিস্তার ঘটানোর আহ্বান জানান।
সভা থেকে সকলের অঙ্গীকার,ফিস্টুলা আক্রান্ত নারীদের স্বাস্থ্য ও অধিকার নিশ্চিত করে একটি প্রসবজনিত ফিস্টুলামুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা।

