বেগম খালেদা জিয়া- বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অনন্য নাম। তিনি শুধু তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী নন, বরং তিনি একজন সাবেক রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী, একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা ও সেক্টর কমান্ডারের সহধর্মিণী এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধানের স্ত্রী। যেহেতু আমি রাজনীতি করিনা, সেহেতু আমি তাকে মূলত উপরোক্ত এই পরিচয়গুলো দিয়েই চিনি। আমি আবারো উল্লেখ করতে চাই- আমি কোনো দল বা মতের রাজনীতি করিনা। অনেকের মতে, উপরোক্ত এই পরিচয়গুলোর যেকোনো একটি দিয়েই তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো- এই স্বীকৃতি তাকে স্বাভাবিক সময়ে কখনোই দেওয়া হয়নি, বরং পরিকল্পিতভাবেই তাকে তা থেকে বঞ্চিত রাখা হয়েছে।
নিরপেক্ষ বিবেচনায় দেখলে, বেগম খালেদা জিয়ার রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পাওয়া কোনো রাজনৈতিক অনুকম্পা নয়, এটি ছিল তার প্রাপ্য অধিকার। সহজ কথায় বলতে গেলে- গণতান্ত্রিক ধারায় নির্বাচিত তিনবারের প্রধানমন্ত্রী হওয়া মানেই তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ দায়িত্ব পালন করেছেন। বেগম খালেদা জিয়াকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দেওয়া হলে তা কারও দয়া, পক্ষপাত বা রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার বিষয় নয়। তিনি তার অবস্থান, দায়িত্ব ও অবদানের কারণে স্বাভাবিকভাবেই এই মর্যাদা পাওয়ার যোগ্য ছিলেন।
তবু দীর্ঘদিন ধরে তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে, তার অসুস্থতা, মানবিক প্রয়োজন ও ন্যূনতম সম্মান পর্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য- চরম অসুস্থতা ও কার্যত মৃত্যুশয্যায় উপনীত হওয়ার পর তাকে ‘রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি’ হিসেবে বিবেচনা করার বাস্তবতা আমাদের রাষ্ট্রচিন্তার দৈন্যকেই প্রকাশ করে। যে স্বীকৃতি তার বহু আগেই পাওয়া উচিত ছিল, তা যেন কেবল করুণা বা পরিস্থিতির চাপে এসে দেওয়া হচ্ছে- এটি কোনো সভ্য রাষ্ট্রের গৌরব হতে পারে না।
এই ঘটনা কোনো ব্যক্তিবিশেষের নয়, এটি একটি রাষ্ট্রীয় প্রবণতার প্রতিচ্ছবি। এদেশে জ্ঞানী, গুণী ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন মানুষের যথাযথ মূল্যায়ন বরাবরই অনুপস্থিত। জীবিত অবস্থায় তাদের অবমূল্যায়ন করা হয়, বিতর্কিত করা হয়, অপমানিত করা হয়- আর মৃত্যু কিংবা মৃত্যুর প্রান্তে পৌঁছালে হঠাৎ করেই রাষ্ট্র তাদের গুরুত্ব আবিষ্কার করে।
এ কারণেই হয়তো এই দেশে মার্টিন লুথার কিং-এর মতো ন্যায়ভিত্তিক নেতৃত্ব জন্ম নেয় না, আব্রাহাম লিংকনের মতো ঐক্যের প্রতীক তৈরি হয় না, জর্জ ওয়াশিংটনের মতো রাষ্ট্রনায়ক কিংবা নেলসন ম্যান্ডেলার মতো আত্মত্যাগী নেতা গড়ে ওঠে না। এমনকি ইতিহাসের বিতর্কিত চরিত্রদের ক্ষেত্রেও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে মূল্যায়নের যে সাহস অন্য রাষ্ট্রগুলো দেখায়, তা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত। এখানে জ্ঞানী হওয়া, নীতিবান হওয়া, স্বাধীন চিন্তার মানুষ হওয়াই যেন আজন্ম অপরাধ।
বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে রাষ্ট্রের আচরণ সেই বাস্তবতারই আরেকটি উদাহরণ। তিনি কোনো নিখুঁত মানুষ নন- কিন্তু রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে তার অবদান, তার অবস্থান ও তার পরিচয় অস্বীকার করার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। রাষ্ট্র যদি তার রাজনৈতিক বিরোধীদের ক্ষেত্রেও ন্যূনতম মানবিকতা ও মর্যাদা রক্ষা করতে না পারে, তবে সেই রাষ্ট্র গণতন্ত্রের দাবি করার নৈতিক অধিকার হারায়।
একজন নেতার মৃত্যু কিংবা মৃত্যুশয্যায় পৌঁছানো স্বাভাবিক ঘটনা হতে পারে, কিন্তু তার মর্যাদাহীন জীবন ও রাষ্ট্রীয় অবহেলা কখনোই স্বাভাবিক হতে পারে না। বেগম খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে যা ঘটেছে, তা শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি অবিচার নয়- এটি রাষ্ট্রের আত্মপরিচয়ের ওপরও এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন।
রাষ্ট্র যদি সত্যিই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিতে চায়, তবে মানুষকে মরার আগে সম্মান দিতে শিখতে হবে। নইলে ইতিহাস বারবার সাক্ষ্য দেবে- এ দেশে গুণী হয়ে জন্ম নেওয়াই যেন এক অভিশাপ, আর তাদের মৃত্যু কখনোই স্বাভাবিক ও সম্মানের সাথে হতে পারে না।
_এম মহাসিন মিয়া, লেখক- পার্বত্য চট্টগ্রাম।

