তিন পার্বত্য জেলা- খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবান শুধু ভৌগোলিক সীমারেখায় পৃথক নয়, সংস্কৃতি, জাতিসত্তা, ঐতিহ্য, জীবনযাপন ও সামাজিক বাস্তবতায়ও সমৃদ্ধ ও বৈচিত্র্যময়। পাহাড়ের মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, অধিকার নিশ্চিতকরণ এবং উন্নয়ন কাঠামোকে সুসংহত করার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ। পর্যায়ক্রমে ৬ মার্চ ১৯৮৯ সালে রাঙামাটি জেলা পরিষদ, ২৫ জুন ১৯৮৯ সালে বান্দরবান জেলা পরিষদ এবং ৬ মার্চ ১৯৮৯ সালে খাগড়াছড়ি জেলা পরিষদ গঠিত হয়।
এই পরিষদ হওয়ার কথা ছিল জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন, উন্নয়ন কার্যক্রম সমন্বয়ের কেন্দ্রবিন্দু এবং পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসরত মানুষের জীবন-সংকট সমাধানের একটি কার্যকর প্রশাসনিক মডেল। কিন্তু দুঃখজনকভাবে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতিষ্ঠান তার মূল উদ্দেশ্য থেকে অনেকটাই বিচ্যুত হয়েছে। এর প্রধান কারণ তৎকালীন কতৃপক্ষের পরিকল্পিত ও স্বার্থান্বেষী আইন ও ধারা এবং নেতৃত্ব নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণের অভাব- অর্থাৎ জনগণ নিজের প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে কাকে দেখতে চায় সেই মৌলিক অধিকারটি তারা পায়নি।
কোনো জনপ্রতিষ্ঠান কখনোই কার্যকর হতে পারে না যদি তার নেতৃত্ব জনগণের মনোনীত না হয়। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের ক্ষেত্রে বহু সময় দেখা গেছে- চেয়ারম্যান ও সদস্যরা জনগণের ভোটে নয়, বরং বিভিন্ন বিবেচনায় “অটো চয়েস” হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত। এর ফলে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা, আর জনগণ দূরে সরে গেছে নিজের প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম থেকে।
জনগণই যখন উন্নয়নের মূল কেন্দ্র, তখন তাদের ভোট ছাড়া নেতৃত্ব নির্ধারণ করা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাছাড়া জেলা পরিষদের পরিকল্পিত ও স্বার্থান্বেষী আইন বলছে নিদিষ্ট জাতি থেকে চেয়ারম্যান চয়েস করতে হবে এবং সদস্যদের ক্ষেত্রেও অনুসরণ করতে হবে নিদিষ্ট জাতিগত সংখ্যার কমবেশি অনুপাত। যা বাংলাদেশের সংবিধান এবং গণতন্ত্র কোনটির সাথেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এ প্রেক্ষিতে পাহাড়ের মানুষ বহুবার দাবি তুলেছে- তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের পদগুলো নিদিষ্ট জাতিগত না হোক, পদগুলো নির্বাচনযোগ্য হোক, যাতে সকল ক্ষেত্রেই জনগণ সরাসরি নেতৃত্ব বেছে নিতে পারে। কারণ স্বার্থবহুল, স্বচ্ছ ও ন্যায়সঙ্গত নেতৃত্ব আসে জনগণের মধ্য থেকেই।
একটি রাষ্ট্র তখনই তার প্রকৃত দায়িত্ব পালন করে যখন সে জনগণের প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের অধিকারেই পরিচালিত হতে দেয়। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে সদস্য পর্যন্ত- সবারই কাজ জনগণের কল্যাণ, জনগণের অধিকার রক্ষা এবং পাহাড়ের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখা। কিন্তু জনগণের চয়েস ছাড়া যখন নেতৃত্ব আসে, তখন জনগণের প্রত্যাশা আর বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ফাঁক তৈরি হয়। যদি জেলা পরিষদের সদস্যরা নির্বাচিত হন প্রকৃত জনগণ থেকে- তাহলে তারা মাঠপর্যায়ের সমস্যাগুলো ভালোভাবে বুঝতে পারবেন। পাহাড়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবহন, বাজার ব্যবস্থাপনা, পর্যটন, জননিরাপত্তা- সব ক্ষেত্রেই তাদের বাস্তবভিত্তিক সিদ্ধান্ত উন্নয়নকে আরও গতিশীল করবে।
তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের বর্তমান কাঠামোর বড় সমস্যা হলো জবাবদিহিতার ঘাটতি। যিনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত নন, তিনি জনগণের কাছে জবাবদিহি কম অনুভব করেন। ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বিশেষ গোষ্ঠী বা ক্ষমতার প্রভাব তার সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে। কিন্তু যখন জনগণের ভোটে একজন নেতা নির্বাচিত হন- তখন তিনি জানেন, প্রতিটি ভুলের দায় তাকে জনগণের কাছে দিতে হবে। এই ভয়, এই দায়িত্ববোধই তাকে সৎ রাখে, নিরপেক্ষ রাখে। স্বচ্ছতা ছাড়া উন্নয়ন মানে কাগজে-কলমে উন্নয়ন। আর জবাবদিহিতা ছাড়া ক্ষমতা অপব্যবহার অনিবার্য। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের প্রতিটি টেন্ডার, প্রতিটি প্রকল্প, প্রতিটি উন্নয়ন উদ্যোগ স্বচ্ছতার মাধ্যমে পরিচালিত হলে জনগণও তার ফল ভোগ করবে। আর নিরপেক্ষতা না থাকলে পাহাড়ের সামাজিক ভারসাম্য, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও শান্তি বিঘ্নিত হয়।
গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করলে যে পরিবর্তনগুলো আসতে পারে। যেমন- শিক্ষা খাতে উন্নতি: জনগণের প্রতিনিধি স্থানীয় বিদ্যালয়, কলেজ ও আবাসিক স্কুলগুলোর বাস্তব সংকট চিহ্নিত করে টেকসই প্রকল্প গ্রহণ করতে পারবেন। স্বাস্থ্যসেবার প্রসার: গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছাতে নতুন নীতিমালা প্রণয়ন সহজ হবে। অবকাঠামো উন্নয়ন: পাহাড়ের প্রকৃতভিত্তিক রাস্তাঘাট, সেতু, সেচব্যবস্থা, পানিসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা আরও কার্যকর হবে। কর্মসংস্থান বৃদ্ধি: স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে প্রকল্পভিত্তিক চাকরি ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের মাধ্যমে। সম্প্রীতি ও সহাবস্থান শক্তিশালী হবে: নিরপেক্ষ নেতৃত্ব সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কমাবে ও আস্থা ফিরিয়ে আনবে। উন্নয়ন অর্থের অপচয় রোধ: নির্বাচিত পরিষদ উন্নয়ন বাজেটের যথাযথ ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করবে। জনগণের অংশগ্রহণমূলক উন্নয়ন: সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রতিটি পর্যায়ে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হবে।
পাহাড়ে শান্তি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা শুধু নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে না, এটি নির্ভর করে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জনগণের আস্থার ওপর। যদি তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নেতৃত্ব জনগণের নির্বাচিত হয়, তবে তারা পার্বত্য জনগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ সমস্যা, প্রত্যাশা ও সংবেদনশীলতা বোঝার ক্ষেত্রে আরও অগ্রগামী ভূমিকা রাখতে পারবেন। কজনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব পাহাড়ে বিদ্যমান নানা ভুল-বোঝাবুঝি, বৈষম্য ও বঞ্চনা কমিয়ে শান্তির সেতু তৈরি করতে পারে। আর এটাই স্থায়ী উন্নয়নের ভিত্তি।
তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ কোনো দলের নয়, কোনো গোষ্ঠীর নয়- এটি জনগণের প্রতিষ্ঠান। আর জনগণের প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বও আসতে হবে জনগণের মাঝ থেকেই। আজ পাহাড়ের মানুষ চায়- একটি জবাবদিহিমূলক পরিষদ, একটি নির্বাচিত পরিষদ, একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পরিষদ। অটো চয়েস নয়- জনগণের চয়েসই হতে হবে নেতৃত্বের উৎস। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদকে কার্যকর ও জনমুখী করতে হলে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নেতৃত্ব নির্বাচন এখন সময়ের দাবি, নৈতিক দাবি ও গণতান্ত্রিক দাবি।
জনগণের মনোনীত নেতৃত্বই পারে পাহাড়ের উন্নয়নকে গতিশীল করতে, শান্তিকে প্রাতিষ্ঠানিক করতে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সমৃদ্ধ পার্বত্য চট্টগ্রাম উপহার দিতে। সুতরাং তিন পার্বত্য জেলা পরিষদে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে জনগণের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়াই এখন সবচেয়ে জরুরি কাজ।
— এম মহাসিন মিয়া, সাংবাদিক ও লেখক, পার্বত্য চট্টগ্রাম।

