২০২৪ সালের ১৬ জুলাই। সেদিন বিকেলে রংপুরে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সামনের সারিতে থাকা ছাত্রনেতা আবু সাঈদ।
বাংলাদেশ জুড়ে যখন সহিংস পরিস্থিতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন আওয়ামী লীগের মন্ত্রীদের অস্বাভাবিক আচরণ আওয়ামী লীগের মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জুলাই আগস্টের ৩৬ দিনের আন্দোলনে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী ও নৃশংস সরকার, ছাত্র-েজনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হয়। এই বিদ্রোহ ১ জুলাই শুরু হয়ে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে শেষ হয়। আন্দোলনে অন্তত ৮৩৪ জন নিহত হয় বলে সরকারি হিসাবে বলা হয়েছে । আরও ২০ হাজার জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে নারী ও শিশুরাও রয়েছে।
এর মাধ্যমে শেখ হাসিনার ১৬ বছরের স্বৈরশাসনের সমাপ্তি হয়। পাঁচ মাস পরও আওয়ামী লীগ নিজেদের পুনর্গঠন করতে লড়াই করছে। দলের অভ্যন্তরে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে– একদিকে ক্ষমাশীল না হওয়া প্রবীণ নেতারা, আর অন্যদিকে মধ্যম স্তরের নেতাকর্মীরা যারা মনে করেন দলকে ভুল থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
অনেক আওয়ামী লীগ নেতা এখনো দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন। দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাসিম ১৬ জানুয়ারি একটি অজানা স্থান থেকে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যম আল জাজিরাকে ফোনে বলেন, ‘আমরা আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের শিকার। এটা শিগগিরই প্রমাণিত হবে।’ তবে তিনি স্পষ্ট করেননি, তিনি কাকে অভিযুক্ত করছেন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এমন দাবি দলটির ব্যর্থতা স্বীকার করতে না পারা এবং জনগণের অসন্তোষ মোকাবিলায় অক্ষমতার পরিচায়ক।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। দেশের সাধারণ জনতার ঢল যখন স্বৈরাচার হাসিনার সরকারি বাসভবনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন হাসিনা তার বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে গণভবন থেকে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টারে ভারতে পালিয়ে যান। আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের একজন সিনিয়র স্থানীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে আল জাজিরাকে বলেন, ‘যখন এই নাটকীয় পালানোর দৃশ্য টিভিতে সম্প্রচারিত হচ্ছিল, তখন আমি খুলনার রাস্তায় কিছু কর্মীর সঙ্গে ছিলাম। আমি স্থানীয় সাংসদের কাছে ফোন করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তার ফোন বন্ধ ছিল। তখনই আমি নিজেকে প্রতারিত মনে করেছি।’
২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ছাত্রলীগকে নিষিদ্ধ করে। খুলনার ওই প্রভাবশালী ছাত্রলীত নেতা বলেন, ‘আমি আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট, ফোন নম্বর- সবকিছু পরিবর্তন করেছি। বেঁচে থাকার জন্য ঢাকায় ছোট ব্যবসা শুরু করেছি। তিনি বলেন আওয়ামী লীগ আমাদের সাথে প্রতারণা করেছে। আমি আর কখনো রাজনীতিতে ফিরে যাব না।’
দেশজুড়ে তৃণমূল কর্মীরা একই ধরনের অনুভূতি প্রকাশ করেছেন।
দলের একটি প্রো-আওয়ামী লীগ ডাক্তারদের সংগঠনের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে একই ধরনের হতাশা ব্যক্ত করেছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক অনুশীলনের অভাব প্রাচিন দলটিকে বিশৃঙ্খল অবস্থায় ফেলে দিয়েছে।
আওয়ামী লীগ এখনও ‘জুলাই আন্দোলন’ নামে পরিচিত ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণজাগরণের সময় তাদের সরকারের কঠোর পদক্ষেপের জন্য আনুষ্ঠানিক কোনো ক্ষমা প্রার্থনা বা বিবৃতি দেয়নি। বরং দলটি বারবার এই আন্দোলনকে অস্বীকার করেছে। উদাহরণস্বরূপ, দলের যুব সংগঠন যুবলীগের ১০ জানুয়ারির এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই আন্দোলনকে ‘সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড’ বলে অভিহিত করা হয়েছে। তাদের দাবি, এটি একটি ‘পাকিস্তানি মতাদর্শে’ দেশকে ঠেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্রের অংশ।
আল জাজিরার সঙ্গে প্রায় এক ঘণ্টার কথোপকথনে নাসিম বারবার ইসলামী ছাত্র শিবিরের ওপর দায় চাপিয়েছেন। তার অভিযোগ, শিবির ‘বিরোধী আন্দোলনের’ আড়ালে ছাত্রদের ‘ভুল পথে পরিচালিত করেছে’।
আওয়ামী লীগের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সরকারের ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে ১১ বছর দায়িত্বে ছিলেন। সম্প্রতি ভারতের শীর্ষ দৈনিক ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ ‘ইসলামি সন্ত্রাসী ও সেনাবাহিনীর যৌথ অভ্যুত্থানের’ শিকার হয়েছে।
তবে দলের ঘনিষ্ঠ অনেকেই তার এই বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন। বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ দলে জবাবদিহিতার অভাব নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি বিজ্ঞানের অধ্যাপক আল মাসুদ হাসানুজ্জামান মনে করেন, ‘অতি উৎসাহী সিদ্ধান্ত শেখ হাসিনার জনপ্রিয়তায় আঘাত হানে, ফলে তার পদত্যাগ জনগণের একমাত্র দাবি হয়ে দাঁড়ায়।’
অধ্যাপক হাসানুজ্জামান আরও বলেন, আওয়ামী লীগ এখন গুরুতর নেতৃত্ব ও ভাবমূর্তির সংকটে পড়েছে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বের ভাবমূর্তি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শেখ হাসিনা ছাড়া দলের পুনর্গঠন কঠিন হবে এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজনও বাড়বে।
দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বিএনপি ও জামায়াত উভয়ই বলেছে, গত জুলাই ও আগস্টে গণহত্যায় জড়িত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিচার হতে হবে। তবে তারা বলেছে, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের জনগণই নির্ধারণ করবে।
হাসিনা সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করা ছাত্র আন্দোলনটি আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ২৫ জানুয়ারির এক পথসভায়, অন্তর্বর্তী ইউনুস সরকারের উপদেষ্টা ও ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা মাহফুজ আলম বলেন, আওয়ামী লীগকে পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া হবে না। তিনি বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হল খুন, গুম ও ধর্ষণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনা, সংস্কার বাস্তবায়ন ও সকল প্রো-বাংলাদেশি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সুষ্ঠু নির্বাচন করা।’

