বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিয়ে ভারতের আগ্রহ নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই তাদের গোয়েন্দা সংস্থা “রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং” বা “র” বাংলাদেশের ভেতরে নানা উপায়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। কখনও নরম কূটনীতি, কখনও অর্থনৈতিক প্রভাব, আবার কখনও গোপন গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে “র” কাজ করছে, এমন একটি বাস্তবতা তৈরিতে যেখানে বাংলাদেশের জনগণ ও দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীর মধ্যে দূরত্ব বাড়ানো যায়। কারণ, এই দূরত্বই “র” এর মাধ্যমে ভারত তাদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র।
বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকে সেনাবাহিনী শুধু একটি প্রতিরক্ষা বাহিনী নয়, বরং জনগণের আস্থা ও ভালোবাসার প্রতীক। প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধার কাজ, দুর্গম এলাকায় স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষায় সহায়তা কিংবা চোরাচালান ও সন্ত্রাস দমনে দেশের প্রতিটি সংকটে সেনাবাহিনী সবসময় জাতির পাশে থেকেছে। এই জনগণ-সেনা ঐক্যই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার মূল স্তম্ভ। কিন্তু বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতে এই ঐক্য এক ধরনের বাঁধা। বিশেষত ভারতের জন্য, কারণ বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী, দেশপ্রেমিক ও সচেতন সেনাবাহিনী মানেই ভারতের আধিপত্যমূলক নীতি বাস্তবায়নে প্রতিবন্ধকতা।
ভারতের “র” সংস্থা দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে প্রভাব বিস্তারের জন্য “সফট পেনিট্রেশন” কৌশল ব্যবহার করে। অর্থাৎ সরাসরি আক্রমণ নয়, বরং প্রশাসনিক ও সামাজিক স্তরে ধীরে ধীরে প্রভাব স্থাপন। বাংলাদেশে তারা এই প্রভাব বিস্তারের জন্য সবচেয়ে আগে বেছে নিয়েছে সামাজিক, রাজনৈতিক ও তথ্যযুদ্ধের ক্ষেত্রগুলোকে। ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভুয়া প্রচারণা, মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব তৈরির প্রচেষ্টা, এসবই “র” এর তথাকথিত “সাইকোলজিক্যাল অপারেশন” এর অংশ। তাদের মূল লক্ষ্য একটাই তারা জনগণের মনে সন্দেহ সৃষ্টি করা, যেন মানুষ সেনাবাহিনীকে দেশরক্ষক নয়, বরং “ভীতিকর বা রাজনীতিক” শক্তি হিসেবে ভাবতে শুরু করে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার প্রায় প্রতিটিতেই ভারতীয় ভিসা অফিস স্থাপন করা হয়েছে। প্রথম নজরে এটি কূটনৈতিক ও প্রশাসনিক সুবিধা মনে হলেও, বাস্তবে এসব অফিসের মাধ্যমে ভারত স্থানীয় পর্যায়ে তাদের নেটওয়ার্ক বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে। ভিসা অফিসের ছত্রছায়ায় গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, রাজনৈতিক নেতা, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী এমনকি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত প্রভাবিত করছে। তাদের কাছে অর্থ, প্রশিক্ষণ, বা নানা সুবিধা পৌঁছে দিয়ে একটি নির্ভরশীল শ্রেণি তৈরি করা হচ্ছে, যারা সচেতন বা অসচেতনভাবে ভারতের স্বার্থে কাজ করছে। এই কৌশল আসলে “র” এর ক্লাসিক পদ্ধতি influence by incentive, অর্থাৎ প্রলোভনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতীয় প্রভাব বহুদিনের পুরোনো ইস্যু। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি আরও সূক্ষ্ম ও গভীর হয়েছে।
“র” শুধু সরকার বা বিরোধী দল নয়, বরং স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলছে। অনেক সময় দেখা যায়, হঠাৎ করেই কোনো আঞ্চলিক রাজনীতিকের উন্নয়ন প্রকল্প বা নির্বাচনী প্রচারণায় ভারতীয় আগ্রহ বেড়ে যায়। এসবের পেছনে থাকে নরম কিন্তু কার্যকরী গোয়েন্দা সমর্থন। “র” জানে, দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে সরাসরি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়, কিন্তু জনগণ ও রাজনীতিকদের মধ্যে বিভাজন তৈরি করে সেনাবাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা গেলে সেনাবাহিনীর দেশপ্রেমিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়বে।
“র” এবং তাদের মিত্র সংগঠনগুলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বিভ্রান্তিমূলক সংবাদ ছড়ানোর জন্য তথাকথিত সিভিল সোসাইটি ও কিছু গণমাধ্যম কর্মীদেরও ব্যবহার করছে। অনেক সময় দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেনাবাহিনীকে কেন্দ্র করে নেতিবাচক বা বিভ্রান্তিকর খবর ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা পরে মিথ্যা প্রমাণিত হয়। কিন্তু ততক্ষণে জনগণের মনে সন্দেহের বীজ বপন হয়ে যায়।
এই পদ্ধতিকে বলা হয় Perception Management Warfare, মানে মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ করে মতামত পরিবর্তন করা।
শুধু রাজনীতি নয়, “র” সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকেও প্রভাব বিস্তার করছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন এনজিও, মিডিয়া হাউস, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমনকি সাংস্কৃতিক সংগঠনের মধ্যেও ভারতের অনুদান বা পৃষ্ঠপোষকতা প্রবেশ করেছে।
এভাবে তারা সমাজের অভিজাত শ্রেণিকে নিজেদের প্রভাববলয়ে আনছে। উদ্দেশ্য একটাই, ভারতের প্রতি সদিচ্ছা তৈরি করা, আর দেশপ্রেমিক ও জাতীয়তাবাদী শক্তিকে চরমপন্থী হিসেবে উপস্থাপন করা।
পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে “র” এর কর্মকাণ্ড সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়। ইউপিডিএফ, জেএসএস ও অন্যান্য বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠনগুলোর সঙ্গে ভারতের যোগাযোগ নিয়ে বহুবার প্রশ্ন উঠেছে। এই সংস্থাগুলোর অনেক নেতাকর্মী ভারতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বলে তথ্য রয়েছে বিভিন্ন নিরাপত্তা প্রতিবেদনে। “র” এই অঞ্চলে বিভাজন সৃষ্টি করে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দীর্ঘায়িত করতে চায়। কারণ, যতদিন পার্বত্য এলাকা অস্থির থাকবে, ততদিন বাংলাদেশকে তাদের “নিরাপত্তা নির্ভরশীল” অবস্থায় রাখা সহজ হবে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশজুড়ে নিরাপত্তা, শান্তি, উন্নয়ন ও মানবিক সহায়তার কাজ করে যাচ্ছে। দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল হোক বা উপকূলীয় এলাকা, সেনাবাহিনীই জনগণের পাশে দাঁড়ায় সবার আগে।
“র” জানে, জনগণ ও সেনাবাহিনীর এই বিশ্বাসের সম্পর্কই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই তারা সোশ্যাল মিডিয়া, রাজনৈতিক মহল এমনকি আন্তর্জাতিক মহলেও এমন প্রচারণা চালায় যেন, সেনাবাহিনীর এই মানবিক ভূমিকা “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে মনে হয়। এই বিভ্রান্তিই ভারত এবং “র” এর মূল লক্ষ্য।
“র” এর এই প্রভাব মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় অস্ত্র হলো জাতীয় ঐক্য ও সচেতনতা। জনগণকে জানতে হবে, সেনাবাহিনী কোনো রাজনৈতিক শক্তি নয়, বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের রক্ষক।
একইসঙ্গে সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকেও প্রযুক্তিনির্ভর তথ্যযুদ্ধের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুয়া খবর শনাক্ত করা, ভিসা অফিস ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের নজরদারি জোরদার করা, এগুলো এখন সময়ের দাবি।
ভারতের “র” সংস্থা বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ করছে না, কিন্তু এক নিঃশব্দ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক ও তথ্যযুদ্ধের মাধ্যমে। তাদের লক্ষ্য সহজ, জনগণ ও সেনাবাহিনীর মাঝে অবিশ্বাস সৃষ্টি করা, যাতে বাংলাদেশকে ভেতর থেকে দুর্বল করা যায়। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যখনই বিদেশি শক্তি বাংলাদেশকে বিভক্ত করার চেষ্টা করেছে, তখনই এই জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তাই এখন সময় এসেছে, আমরা সবাই একসঙ্গে বলি “বাংলাদেশের সেনাবাহিনী আমাদের গর্ব, আমাদের বিশ্বাস, আমাদের রক্ষক এবং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতিক।
যে শক্তি এই বন্ধন ভাঙতে চায়, তারা পরাজিত হবেই, কারণ সত্যিকারের দেশপ্রেমের শক্তি কোনো প্রোপাগান্ডা দিয়ে দমন করা যায় না।
__এম মহাসিন মিয়া, লেখক, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা।

