খাগড়াছড়িতে মারমা সম্প্রদায়ের প্রাণের উৎসব সাংগ্রাই উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী আয়োজন শেষ হয়েছে বর্ণিল, প্রাণবন্ত ও উৎসবমুখর পরিবেশে। ঐতিহ্য, সংস্কৃতি আর আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভরপুর এ আয়োজনের শেষ দিনটি পরিণত হয় এক বিশাল মিলনমেলায়, যেখানে নানা বয়সী মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) বিকেলে সাংগ্রাই মেলা উদযাপন কমিটির উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয় বহুল প্রতীক্ষিত ঐতিহ্যবাহী বলী খেলা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত প্রায় ৩০ জন খ্যাতিমান বলীর অংশগ্রহণে প্রতিযোগিতাটি ছিল অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। দর্শকদের উল্লাস, করতালি আর শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্তের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এই খেলায় কুমিল্লা থেকে আগত শক্তিশালী বলী রাসেল মাল অসাধারণ কৌশল, শক্তি ও ধৈর্যের প্রদর্শন করে প্রতিদ্বন্দ্বী আরেশি মারমাকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তার এই জয়ে মাঠজুড়ে আনন্দধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে।
বলী খেলা ঘিরে দর্শকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। আশপাশের এলাকা ছাড়াও দূর-দূরান্ত থেকে আগত দর্শনার্থীদের ভিড়ে মেলা প্রাঙ্গণ পরিণত হয় এক জনসমুদ্রে। ঐতিহ্যবাহী এই খেলাকে ঘিরে নতুন প্রজন্মের মধ্যেও ছিল ব্যাপক আগ্রহ।
খেলা শেষে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন সাংগ্রাই মেলা উদযাপন কমিটির আহ্বায়ক অংহ্লা প্রু মারমা। সভায় বক্তারা বলেন, সাংগ্রাই শুধু একটি উৎসব নয়, এটি মারমা সম্প্রদায়ের হাজার বছরের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক সম্প্রীতির প্রতীক। এ ধরনের আয়োজন নতুন প্রজন্মকে নিজেদের সংস্কৃতির প্রতি আগ্রহী করে তোলে এবং পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সহাবস্থানের বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
আলোচনা সভা শেষে সপ্তাহজুড়ে আয়োজিত বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা ও প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। মারমা সম্প্রদায়ের নিজস্ব ‘ধ’ ও ‘আলাড়ি’ খেলাসহ নানা গ্রামীণ খেলায় অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিল ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। বিজয়ীদের হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়ার সময় আনন্দঘন মুহূর্ত সৃষ্টি হয়।
দিনব্যাপী আয়োজনের শেষ পর্বে অনুষ্ঠিত হয় মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও জমজমাট কনসার্ট। স্থানীয় ও অতিথি শিল্পীদের পরিবেশনায় গান, নাচ ও সংগীতের তালে তালে দর্শকরা মেতে ওঠেন উৎসবের আমেজে। আলো-ঝলমলে মঞ্চ আর প্রাণবন্ত পরিবেশনা পুরো আয়োজনকে দেয় ভিন্নমাত্রা, যা রাত পর্যন্ত দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখে।
অনুষ্ঠানে জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি মো. বেলাল হোসেনসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, সাংগ্রাই উৎসব মারমা সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব, যা বাংলা নববর্ষকে ঘিরে উদযাপিত হয়। প্রতিবছরের মতো এবারও উৎসবটি নতুন প্রজন্মের মাঝে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। সাংগ্রাই কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়, এটি পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়, ঐতিহ্য ও সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক,যা মানুষকে তার শেকড়ের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত করে এবং ভ্রাতৃত্ববোধকে আরও সুদৃঢ় করে তোলে।

