যৌক্তিক কিংবা অযৌক্তিক– যেটাই হোক, দাবি হাসিলের ‘মোক্ষম জায়গা’ হয়ে উঠেছে রাজপথ। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর যেন বয়ে যাচ্ছে দাবি-দাওয়ার নহর। হুটহাট সড়ক-মহাসড়কে নেমে বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে যান চলাচল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে বসে থাকার শঙ্কা নিয়েই ঘর থেকে বের হচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
আন্দোলনের সামনে পড়লেই সব শ্রেণি-পেশার মানুষের সীমাহীন বিপত্তির পাশাপাশি দিনের পরিকল্পনায় পড়ে যাচ্ছে সীমাহীন দুর্ভোগ। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক, নির্দিষ্ট গন্তব্যের গাড়ি রাস্তায় চলছে কিনা, তা নগরবাসীকে ৯৯৯-এ ফোন করে জেনে নেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছে খোদ ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জনশৃঙ্খলা ভেঙে পড়ে। নাজুক পরিস্থিতি পার করতে হয় পুলিশ বাহিনীকে। প্রথমে কয়েক দিন রাস্তায় ট্রাফিক পুলিশ সদস্যদের দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই নানা সংগঠন, পেশাজীবী, ছাত্র-শ্রমিক বিভিন্ন দাবিতে রাজপথে আন্দোলন শুরু করেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর কেউ কেউ মানুষকে বেকায়দায় ফেলে দাবি আদায়ের চেষ্টা করছে। এটি কাম্য নয়। এমন কৌশল আগেও দেখা গেছে। দাবি-দাওয়ার মধ্য দিয়ে কেউ হীন স্বার্থ হাসিল করছে কিনা, তা খতিয়ে দেখা উচিত।
তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, জানুয়ারিতেই নানা দাবিতে ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ১১ বার অবরোধের মুখে পড়েছে। এ ছাড়া গেল ২৮ দিনে শুধু ঢাকাতেই দাবি আদায়ে সড়ক অবরোধ, বিক্ষোভের মতো উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে ১৬টি। এ ছাড়া শতাধিক আন্দোলন হয়েছে রাজপথে।
এদিকে আন্দোলনের স্রোত দেখে গেল ২৬ আগস্ট পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বাংলাদেশ সচিবালয় ও প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবন যমুনার আশপাশের এলাকায় সব ধরনের সভা-সমাবেশ, মিছিল, শোভাযাত্রা ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। সেই গণবিজ্ঞপ্তিরও ধার ধারেননি আন্দোলনকারীরা। বিজ্ঞপ্তি দিয়ে হুঁশিয়ারির পরও সচিবালয় ঘিরে বিক্ষোভকারীর অবস্থান দেখা গেছে।
চিকিৎসা ও রেলের মতো জরুরি সেবা বন্ধ করে দাবি আদায়ের মতো ঘটনাও ঘটেছে অহরহ। মঙ্গলবার রাত থেকে সারাদেশে ট্রেন চলাচল বন্ধ করে কর্মবিরতিতে যান রেলওয়ের রানিং স্টাফরা। পরে অবশ্য বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের সমঝোতা হয়।
গত সোমবার শাহবাগ অবরোধ করেন ইবতেদায়ি শিক্ষকরা। আগের দিন রোববারও চাকরি স্থায়ী করার দাবিতে শাহবাগ অবরোধ করেন তারা। সেই দিন পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হয়। এ ছাড়া রোববার পরীক্ষার গুচ্ছ পদ্ধতি বহালের দাবিতে আগারগাঁওয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সামনে বিক্ষোভ ও অবরোধ করেন শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা।
২২ জানুয়ারি মালয়েশিয়া পাঠানোর দাবিতে কারওয়ান বাজার মোড় অবরোধ করেন প্রবাসীরা। একই দিন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করেছিলেন বেক্সিমকোর ১৬ কারখানার কর্মহীন শ্রমিকরা।
১৫ জানুয়ারি পাঠ্যপুস্তকে আদিবাসী শব্দসংবলিত গ্রাফিতি পুনর্বহালের দাবিতে মতিঝিলে বিক্ষোভকারীরা হামলার শিকার হন। ১৪ জানুয়ারি বেক্সিমকোর শ্রমিকরা গাজীপুর ও আশুলিয়ায় কয়েক কিলোমিটারজুড়ে মানববন্ধন করেন।
এছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, তিতুমির কলেজ, ঢাকা কলেজের ছাত্র-ছাত্রীরা নানা দাবিতে সড়ক অবরোধ করেন।
গত ১৯ নভেম্বর হাইকোর্টের এক নির্দেশনার বিরোধিতা করে ঢাকার রাজপথে আন্দোলনে নামেন ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকরা। তারা ঢাকার বিভিন্ন এলাকার সড়ক আটকে শুরু করেন আন্দোলন। ২১ নভেম্বর ঢাকার মহাখালীতে ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বড় সংঘর্ষ হয়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে মঙ্গলবার থেকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ আংশিক ট্রাফিক কার্যক্রম চালু করেছে ডিএমপি। বাসা থেকে বের হওয়ার আগে ৯৯৯-এ ফোন করে রাস্তায় গাড়ি চলাচল করছে কিনা– জেনে নেওয়ার জন্য নগরবাসির প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ডিএমপি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক বলেন, ঢাকা এখন দাবি-দাওয়ার নগরে পরিণত হয়েছে। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সরকার অনেকের দাবি যৌক্তিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে সমাধান করেছে। তবে কেউ কেউ মানুষকে বেকায়দায় ফেলে দাবি আদায়ের চেষ্টা করছে। দাবি আদায়ের এমন কৌশল অতীতেও দেখা গেছে। দাবি-দাওয়ার মধ্য দিয়ে কারও হীন স্বার্থ রয়েছে কিনা– খতিয়ে দেখা উচিত। আবার কেউ সত্যিকার অর্থে বঞ্চিত হয়ে থাকলে তাদের বিষয় দ্রুত ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে বিবেচনা করা দরকার।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সম্প্রতি বলেছেন, আমরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। তবে যারা বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন ও সমাবেশ করছেন, তারা ভেন্যু হিসেবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ব্যবহার করলে রাস্তা বন্ধ হবে না; যানজট কমবে।

